ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বিদায়ের প্রেক্ষাপটে পরবর্তী নেতা হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির সামনে থাকা মৌলিক সমস্যাগুলো অপরিবর্তিত থাকবে। প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি ঋণের চাপ—সবকিছুই নতুন সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
প্রবৃদ্ধির সংকট কাটবে কীভাবে?
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর থেকে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্বল প্রবৃদ্ধি। ১৯৯৮ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে দেশটির বার্ষিক গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। এরপর তা নেমে এসেছে সামান্য ১ শতাংশের কিছু বেশি পর্যায়ে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন থমকে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। কিয়ার স্টারমার ও র্যাচেল রিভস রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করার লক্ষ্য পূরণ হয়নি। অন্যদিকে ঘোষিত বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগের পুরো প্রভাবও এখনো অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হয়নি।
এ অবস্থায় বার্নহ্যামের ‘ম্যানচেস্টারিজম’ দর্শনও সম্ভবত সরকারি বিনিয়োগকে প্রবৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করবে।

মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো রয়ে গেছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাবর্তন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২১ সালের শুরু থেকে দেশটিতে সামগ্রিক মূল্যস্তর ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যেখানে এর আগের পাঁচ বছরে বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৯ শতাংশ।
মহামারির কারণে সরবরাহব্যবস্থার সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেলের বাজারে ধাক্কা—এসব কারণ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে।
সমালোচকদের মতে, নিয়োগকর্তাদের জাতীয় বীমা অবদান বৃদ্ধি এবং ন্যূনতম মজুরি দ্রুত বাড়ানোর সিদ্ধান্তও ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়িয়েছে। বার্নহ্যাম এ ধরনের নীতির সমালোচক হলেও ভবিষ্যতে তিনি কী বিকল্প পথ নেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বেকারত্ব ও তরুণদের চাকরির সংকট
২০২৪ সালে লেবার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেকারত্ব ধীরে ধীরে বেড়েছে। সর্বশেষ হিসাবে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ক্ষমতা গ্রহণের সময় ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ।

একই সময়ে বেতনভুক্ত কর্মসংস্থান কমেছে এবং নতুন চাকরির সুযোগও হ্রাস পেয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো তরুণদের বেকারত্ব। এই হার এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশের বেশি পর্যায়ে উঠেছে।
খুচরা বিক্রয় ও আতিথেয়তা খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ কর এবং ন্যূনতম মজুরির চাপ তরুণ কর্মী নিয়োগকে কঠিন করে তুলেছে। তবে এসব নীতি প্রত্যাহার করলেও সরকারের সামনে রাজস্ব ঘাটতির নতুন প্রশ্ন তৈরি হবে।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের লড়াই
স্টারমার সরকারের একটি ইতিবাচক দিক ছিল মজুরির বৃদ্ধি। প্রায় দুই বছর ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির থাকা আয় কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে।
তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেনি। জনমত জরিপগুলো দেখাচ্ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো ব্রিটিশ ভোটারদের প্রধান উদ্বেগগুলোর একটি। মানুষের কাছে আয় বাড়ার সুফল পুরোপুরি পৌঁছায়নি, কারণ প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয়ও অনেক বেশি।
বার্নহ্যামের ধারণা, প্রয়োজনীয় কিছু খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো গেলে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানো সম্ভব হতে পারে।

ঋণ ও সরকারি অর্থব্যবস্থার চাপ
নতুন নেতৃত্বের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ সম্ভবত সরকারি অর্থব্যবস্থা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকারের ঋণ গ্রহণ পূর্বাভাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখন ৯৫ দশমিক ১ শতাংশ, যা ১৯৬০-এর দশকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। উচ্চ সুদের হার সরকারের ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণকে আরও কঠিন করে তুলছে।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যদি একদিকে বড় পরিসরের রাষ্ট্রীয় ভূমিকা বজায় রাখতে চান, অন্যদিকে ঋণ কমানো ও বাজেট ভারসাম্যে আনার প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে চান, তাহলে তাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নতুন সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা অনেকটাই নির্ভর করবে এই জটিল সমীকরণ সামাল দেওয়ার ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















