ইরান যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির মর্যাদা বাড়িয়েছে। তবে এই কূটনৈতিক সাফল্য পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে কতটা সহায়ক হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে রয়েছে সতর্ক মূল্যায়ন।
গত সপ্তাহান্তে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির অংশ নেন। কয়েক মাস ধরে চলা আলোচনার ধারাবাহিকতায় এই বৈঠককে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরানসহ একাধিক দেশের নেতা পাকিস্তানের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক সংকট প্রশমনে ভূমিকা
ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারত। এমন পরিস্থিতি এড়াতে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমিয়ে আনতে পাকিস্তানের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
এই সাফল্যের ফলে ২৫ কোটি মানুষের দেশ পাকিস্তান নতুন করে বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রে এসেছে। সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা মনে করছেন, শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজ করা একটি দেশ হিসেবে পাকিস্তান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা
পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা খুররম শাহজাদের মতে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখা একটি দেশের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ে। তিনি মনে করেন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেছেন, এই উদ্যোগ পাকিস্তানকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে পারে।
অন্যদিকে সাবেক অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইল মনে করেন, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে দুই দেশের সীমান্তবর্তী বেলুচিস্তান অঞ্চলে ব্যাপক বাণিজ্য সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।
অতীতের অভিজ্ঞতা সতর্ক করছে
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান অতীতেও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ার ফলে দেশটি ঋণ পুনঃতফসিল, আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা এবং বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক খুররম হুসেইন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনেক দিক থেকে ৯/১১-পরবর্তী সময়ের মতো হলেও এবার পাকিস্তান যুদ্ধের অংশীদার নয়, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যস্থতাকারী। ফলে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, উপসাগরীয় দেশ, তুরস্ক ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কাঠামোগত সংস্কারই মূল চ্যালেঞ্জ
তবে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের মতে, কূটনৈতিক সাফল্য একা পাকিস্তানের গভীর অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। দেশটি এখনও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, দুর্বল রপ্তানি সক্ষমতা, সীমিত করভিত্তি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপের মুখে রয়েছে।
মিফতাহ ইসমাইলের ভাষায়, আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেলেও তা সরাসরি অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা দূর করবে না। পাকিস্তানকে নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেকেই করতে হবে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিম ইজাজ খাজা মনে করেন, স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সুবিধার বদলে পাকিস্তানের উচিত শিক্ষা বিনিময়, বৃত্তি কর্মসূচি, বস্ত্র ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাজার সুবিধা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সবুজ বিনিয়োগে জোর দেওয়া।

ব্রিটিশ সরকারের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী হ্যামিশ ফ্যালকনারও পাকিস্তানের শান্তি উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেছেন, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বড় সুযোগ রয়েছে।
‘পিস পিভট’ নীতির আহ্বান
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আতিফ মিয়ান মনে করেন, পাকিস্তানের উচিত কূটনৈতিক সাফল্যকে নতুন ঋণ বা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি সংযোগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল গড়ে তোলা।
তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মালিক সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে আগামী দশকগুলোতে পাকিস্তান আরও বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধ অবসানে পাকিস্তানের ভূমিকা দেশটির জন্য নতুন কূটনৈতিক সুযোগের দরজা খুলেছে। কিন্তু এই সাফল্যকে টেকসই অর্থনৈতিক অর্জনে রূপ দিতে হলে কাঠামোগত সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তনের বিকল্প নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















