দুর্বল রাজস্ব আদায়, বাজেট বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সরকারের সাম্প্রতিক বাজেট পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, ব্যয়ের চাহিদা বাড়লেও সেই অনুপাতে রাজস্ব আদায় না হওয়ায় আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাজস্ব আদায়ে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা
বাজেট পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, দেশে দীর্ঘদিন ধরেই মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় কর আদায়ের হার ৮ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। আঞ্চলিক ও সমমানের অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় এটি অনেক কম। ফলে সরকারের নিজস্ব উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আদায় ৩ লাখ ২৯ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। তবে এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
বাজেট বাস্তবায়নে বড় বাধা
শুধু রাজস্ব নয়, বাজেট বাস্তবায়নেও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য মূল বাজেট ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও পরে তা সংশোধন করে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
তবুও বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে ব্যয় পরিকল্পনায় আরও সমন্বয় করতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সংশোধিত বাজেটের মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার ছিল মাত্র ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব আহরণ, ব্যয় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার মধ্যে বাস্তবসম্মত সমন্বয় না থাকলে উচ্চাভিলাষী বাজেট লক্ষ্য অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বাড়ছে বাজেট ঘাটতি
২০০৫-০৬ অর্থবছরে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং মোট ব্যয় ছিল জিডিপির ১১ দশমিক ১ শতাংশ। তখন বাজেট ঘাটতি ছিল নিয়ন্ত্রণযোগ্য, মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ।
অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় একই অবস্থানে থাকলেও সরকারি ব্যয় বেড়ে জিডিপির ১২ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে বাজেট ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি।
পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে এই ঘাটতি আরও বিস্তৃত হয়েছে।

ঋণের বোঝা ও সুদের ব্যয় বৃদ্ধি
ক্রমাগত বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ২০০৬ সালে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর ফলে ঋণের সুদ পরিশোধের চাপও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছিল ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়।
শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজন সংস্কার
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি সম্প্রসারণ, বাজেট বাস্তবায়ন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্কতা জরুরি। একই সঙ্গে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কার্যকর সংস্কার গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বল্প রাজস্ব, উচ্চ ব্যয় এবং বাড়তে থাকা ঋণের চাপ অব্যাহত থাকলে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















