যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতার ফলে তেহরান সাময়িকভাবে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে চার দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা জটিল নিষেধাজ্ঞা কাঠামো দ্রুত তুলে নেওয়া সহজ হবে না বলে মনে করছেন নীতি বিশ্লেষক, আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা।
গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তির রূপরেখা তৈরি করবে। সেই সময়সূচি অনুসারে ওয়াশিংটন ধাপে ধাপে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে। প্রয়োজন হলে এই সময়সীমা আরও বাড়ানো যেতে পারে।
এরই অংশ হিসেবে সোমবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় একটি অস্থায়ী সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছে। এর আওতায় ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানি উৎসের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, শুধু এই দুই মাসের সুযোগ থেকেই ইরান প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে।
জটিল নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস
১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং কূটনীতিকদের জিম্মি করার ঘটনার পর প্রথমবারের মতো ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর পারমাণবিক কর্মসূচি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা যুক্ত হয়েছে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আরও কয়েকটি দেশ ও জোটও ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে নিষেধাজ্ঞার কাঠামো এখন বহুস্তরবিশিষ্ট এবং অত্যন্ত জটিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক নিষেধাজ্ঞা প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে প্রত্যাহার করা সম্ভব হলেও কিছু নিষেধাজ্ঞা সরাসরি মার্কিন কংগ্রেসের আইনে অন্তর্ভুক্ত। সেগুলো বাতিল বা সংশোধন করতে আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

কংগ্রেসে আপত্তি ও রাজনৈতিক বাধা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কিছু পদক্ষেপ বাতিল করতে পারলেও হামাস, হিজবুল্লাহ বা অন্যান্য সংগঠন সংশ্লিষ্ট কিছু নিষেধাজ্ঞা আইন দ্বারা নির্ধারিত। ফলে সেগুলো পরিবর্তনের জন্য কংগ্রেসের সমর্থন অপরিহার্য।
কিন্তু অন্তর্বর্তী এই সমঝোতা ইতোমধ্যেই রিপাবলিকান দলের অনেক সদস্যের সমালোচনার মুখে পড়েছে। ফলে চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পথে রাজনৈতিক বাধা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় থাকা হাজারো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, জাহাজ ও বিমানের নাম প্রত্যাহার করতেও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে।
ব্যবসায়ীদের সতর্ক অবস্থান
নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও আন্তর্জাতিক ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান ও জ্বালানি কোম্পানিগুলো দ্রুত ইরানে ফিরবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধ, আইনি ঝুঁকি এবং সুনামগত উদ্বেগের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও সতর্ক অবস্থান নিতে পারে।
বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক, সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ঝুঁকি এবং যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা জাতিসংঘের পৃথক নিষেধাজ্ঞা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি বর্তমান শিথিলতা স্থায়ী রূপ পায়, তাহলে ইরানের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তেল চীন কিনে থাকে। নতুন পরিস্থিতিতে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং তেহরানের আয় কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা ছাড়া আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো বড় অঙ্কের বিনিয়োগে এগোবে না। ফলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা এলেও ইরানের জন্য পূর্ণ অর্থনৈতিক স্বস্তি পেতে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















