১০:৩০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাণিজ্যের নতুন পথ, জলবায়ুর পুরোনো বিপদ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ভিসায় নতুন বাস্তবতা: আর্থিক সক্ষমতার পরীক্ষায় অনিশ্চিত গ্রিন কার্ড পাকিস্তানে পেট্রোল ভর্তুকিতে ৩০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন পটিয়ায় কক্সবাজার এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত, ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব, দূরপাল্লায় ২০ পয়সা ও শহরে ১৮ পয়সা তৃতীয় দেশে নির্বাসন: পানামায় পাঠানো ইরানি খ্রিষ্টানের অনিশ্চিত জীবন জার্মানিতে ডানপন্থার উত্থানের জ্বালানি: হারিয়ে যাওয়া গৌরবের নস্টালজিয়া জিন্নাহর প্রতিকৃতি সরানোয় তাইয়েবকে হুমকির অভিযোগ, তদন্তের দাবি এডিপি বাস্তবায়নে পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন হার, দুই মাসে অগ্রগতি মাত্র ১.৮৫ শতাংশ ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ১,৬৫৫

আবাসন শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, জাতি গঠনেরও শক্তিশালী হাতিয়ার

রাষ্ট্র গঠনের আলোচনা সাধারণত অর্থনীতি, শিক্ষা, অবকাঠামো কিংবা নিরাপত্তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। কিন্তু এমন একটি বিষয় রয়েছে, যা প্রায়ই সামাজিক নীতির একটি সাধারণ খাত হিসেবে বিবেচিত হয়, অথচ বাস্তবে তা জাতীয় পরিচয় ও সামাজিক সংহতি নির্মাণে গভীর ভূমিকা রাখতে পারে। সেই বিষয়টি হলো জনসাধারণের জন্য পরিকল্পিত আবাসন।

একটি রাষ্ট্রের নাগরিকেরা নিজেদের কতটা একই জাতির অংশ হিসেবে ভাবেন, তা কেবল ইতিহাস বা ভাষার ওপর নির্ভর করে না। তাদের দৈনন্দিন জীবন, বসবাসের পরিবেশ এবং সামাজিক মেলামেশার ধরনও জাতীয় পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে এই বাস্তবতা আরও বেশি প্রযোজ্য।

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে দেশটি এমন একটি জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে জাতিগত শিকড়ের চেয়ে নাগরিক পরিচয় অধিক শক্তিশালী। চীনা, মালয়, ভারতীয় বা অন্য কোনো বংশগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অধিকাংশ মানুষ নিজেদের প্রথমে সিঙ্গাপুরিয়ান হিসেবে পরিচয় দেন। এই পরিবর্তন হঠাৎ করে ঘটেনি; এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রনীতি কাজ করেছে।

সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা নেতা লি কুয়ান ইউ শুরু থেকেই আবাসনকে কেবল একটি কল্যাণমূলক কর্মসূচি হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে জাতি গঠনের একটি কৌশলগত উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। রাষ্ট্র-পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীকে একই কমিউনিটিতে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়। এর ফলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমে এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়ে।

এই নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সমন্বিত নগর পরিকল্পনা। সেখানে শুধু বাড়ি নির্মাণ করা হয়নি; বরং স্কুল, পার্ক, গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সামাজিক সুবিধা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ নগর সম্প্রদায় গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে আবাসন প্রকল্পগুলো নাগরিক জীবনের মান উন্নয়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও শক্তিশালী করেছে।

আজ সিঙ্গাপুরের বিপুল সংখ্যক মানুষ সরকারি আবাসনে বসবাস করেন এবং দেশটির গৃহমালিকানার হার বিশ্বের সর্বোচ্চগুলোর একটি। এই সাফল্যের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, বরং নাগরিক মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তির ধারণাও কাজ করেছে। মানুষ যখন নিজেদের ঘর ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযুক্ত বোধ করে, তখন রাষ্ট্রের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।

এই বাস্তবতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। বহু দেশে আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও সীমিত কল্যাণমূলক উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং সামাজিক বৈষম্যের যুগে আবাসনকে আরও বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন। এটি শুধু আশ্রয় প্রদানের বিষয় নয়; বরং নাগরিক অংশগ্রহণ, সামাজিক স্থিতি এবং জাতীয় সংহতি গড়ে তোলার একটি কার্যকর মাধ্যম।

বিশেষত যেসব সমাজে আঞ্চলিক, ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক বিভাজন বিদ্যমান, সেখানে পরিকল্পিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন নীতি সামাজিক দূরত্ব কমাতে সহায়তা করতে পারে। প্রতিবেশী হিসেবে একসঙ্গে বসবাসের অভিজ্ঞতা প্রায়ই রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বেশি কার্যকরভাবে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা তৈরি করে।

রাষ্ট্রের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে নাগরিকদের মধ্যে একটি অভিন্ন জাতীয় চেতনা গড়ে তোলা জরুরি। সেই লক্ষ্য অর্জনে আবাসনকে কেবল নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ একটি ঘর শুধু একজন মানুষের ঠিকানা নয়; সঠিক পরিকল্পনায় সেটি একটি শক্তিশালী জাতির ভিত্তিও হয়ে উঠতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাণিজ্যের নতুন পথ, জলবায়ুর পুরোনো বিপদ

আবাসন শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, জাতি গঠনেরও শক্তিশালী হাতিয়ার

০৬:৩৫:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

রাষ্ট্র গঠনের আলোচনা সাধারণত অর্থনীতি, শিক্ষা, অবকাঠামো কিংবা নিরাপত্তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। কিন্তু এমন একটি বিষয় রয়েছে, যা প্রায়ই সামাজিক নীতির একটি সাধারণ খাত হিসেবে বিবেচিত হয়, অথচ বাস্তবে তা জাতীয় পরিচয় ও সামাজিক সংহতি নির্মাণে গভীর ভূমিকা রাখতে পারে। সেই বিষয়টি হলো জনসাধারণের জন্য পরিকল্পিত আবাসন।

একটি রাষ্ট্রের নাগরিকেরা নিজেদের কতটা একই জাতির অংশ হিসেবে ভাবেন, তা কেবল ইতিহাস বা ভাষার ওপর নির্ভর করে না। তাদের দৈনন্দিন জীবন, বসবাসের পরিবেশ এবং সামাজিক মেলামেশার ধরনও জাতীয় পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে এই বাস্তবতা আরও বেশি প্রযোজ্য।

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে দেশটি এমন একটি জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে জাতিগত শিকড়ের চেয়ে নাগরিক পরিচয় অধিক শক্তিশালী। চীনা, মালয়, ভারতীয় বা অন্য কোনো বংশগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অধিকাংশ মানুষ নিজেদের প্রথমে সিঙ্গাপুরিয়ান হিসেবে পরিচয় দেন। এই পরিবর্তন হঠাৎ করে ঘটেনি; এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রনীতি কাজ করেছে।

সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা নেতা লি কুয়ান ইউ শুরু থেকেই আবাসনকে কেবল একটি কল্যাণমূলক কর্মসূচি হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে জাতি গঠনের একটি কৌশলগত উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। রাষ্ট্র-পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীকে একই কমিউনিটিতে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়। এর ফলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমে এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়ে।

এই নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সমন্বিত নগর পরিকল্পনা। সেখানে শুধু বাড়ি নির্মাণ করা হয়নি; বরং স্কুল, পার্ক, গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সামাজিক সুবিধা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ নগর সম্প্রদায় গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে আবাসন প্রকল্পগুলো নাগরিক জীবনের মান উন্নয়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও শক্তিশালী করেছে।

আজ সিঙ্গাপুরের বিপুল সংখ্যক মানুষ সরকারি আবাসনে বসবাস করেন এবং দেশটির গৃহমালিকানার হার বিশ্বের সর্বোচ্চগুলোর একটি। এই সাফল্যের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, বরং নাগরিক মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তির ধারণাও কাজ করেছে। মানুষ যখন নিজেদের ঘর ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযুক্ত বোধ করে, তখন রাষ্ট্রের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।

এই বাস্তবতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। বহু দেশে আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও সীমিত কল্যাণমূলক উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং সামাজিক বৈষম্যের যুগে আবাসনকে আরও বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন। এটি শুধু আশ্রয় প্রদানের বিষয় নয়; বরং নাগরিক অংশগ্রহণ, সামাজিক স্থিতি এবং জাতীয় সংহতি গড়ে তোলার একটি কার্যকর মাধ্যম।

বিশেষত যেসব সমাজে আঞ্চলিক, ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক বিভাজন বিদ্যমান, সেখানে পরিকল্পিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন নীতি সামাজিক দূরত্ব কমাতে সহায়তা করতে পারে। প্রতিবেশী হিসেবে একসঙ্গে বসবাসের অভিজ্ঞতা প্রায়ই রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বেশি কার্যকরভাবে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা তৈরি করে।

রাষ্ট্রের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে নাগরিকদের মধ্যে একটি অভিন্ন জাতীয় চেতনা গড়ে তোলা জরুরি। সেই লক্ষ্য অর্জনে আবাসনকে কেবল নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ একটি ঘর শুধু একজন মানুষের ঠিকানা নয়; সঠিক পরিকল্পনায় সেটি একটি শক্তিশালী জাতির ভিত্তিও হয়ে উঠতে পারে।