যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে মার্কিন ভোক্তাদের জীবনযাত্রায়। পেট্রোলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই গাড়ি কম ব্যবহার করছেন, গণপরিবহনে ঝুঁকছেন কিংবা জ্বালানি-সাশ্রয়ী গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তনের কিছু অংশ দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হয়ে যেতে পারে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের চাহিদা আগের মাত্রায় আর নাও ফিরতে পারে।
অভ্যাস বদলে যাচ্ছে
ফিলাডেলফিয়ার ৮৯ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিল্পশিক্ষক জুডি ভাসালো আগে নিয়মিত নিজের গাড়ি চালিয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে যেতেন। কিন্তু যুদ্ধের পর পেট্রোলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় তিনি বিনামূল্যের সিটি বাস ব্যবহার শুরু করেন। এখন তিনি মনে করেন, বাসে চলাচল আরও সহজ এবং সাশ্রয়ী।
জ্বালানির উচ্চমূল্য অনেক মার্কিন নাগরিককে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। ডাও জোনস এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের ব্যবহার আগের বছরের তুলনায় ৬.১ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এর একটি বড় অংশ সরাসরি উচ্চমূল্যের প্রতিক্রিয়া।
কমছে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো এখন অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ভ্রমণ কমিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ সড়কভ্রমণ, খেলাধুলা বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে যাওয়া আগের তুলনায় সীমিত হয়ে এসেছে।
এদিকে করোনার পর দূর থেকে কাজের সুযোগ বাড়ায় অনেক কর্মীকে প্রতিদিন অফিসে যেতে হয় না। ফলে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতাও কমছে। বিশ্লেষকদের মতে, কর্মক্ষেত্রে এই নমনীয়তা পেট্রোলের চাহিদা আরও কমিয়ে দিতে পারে।
হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝোঁক
উচ্চ জ্বালানি ব্যয় অনেককে নতুন ধরনের গাড়ির দিকে আকৃষ্ট করছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কক্স অটোমোটিভ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হাইব্রিড গাড়ির বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্রেতা এখন অনলাইনে জ্বালানি-সাশ্রয়ী গাড়ির বিকল্প খুঁজছেন।
ডেনভারের এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসক ক্যারিন রান্তা-কারান আগে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের পর জ্বালানির অনিশ্চয়তা দেখে তিনি ব্যবহৃত একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনেছেন। তার মতে, এটি ছিল বাস্তবতার কারণে নেওয়া একটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।
তবে সবার জন্য এমন পরিবর্তন সহজ নয়। গাড়ির দাম এখনও অনেক বেশি, ঋণের সুদও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ পুরোনো এবং কম জ্বালানি-দক্ষ গাড়ি ব্যবহার করতেই বাধ্য হচ্ছেন।
অর্থনীতির চাপে পরিবার ও ব্যবসা
দক্ষিণ ডাকোটার কৃষক কিয়ারস্টেন ওডম্যানের মতো অনেকের জন্য জ্বালানি ব্যয় কমানোর সুযোগ নেই। কৃষিকাজ ও পণ্য পরিবহনের জন্য নিয়মিত ডিজেল ও পেট্রোল কিনতেই হচ্ছে। এতে মাসিক ব্যয় কয়েকশ ডলার বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে পারিবারিক বাজেট এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে এখনও তেলচালিত হিটিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। যুদ্ধের পর এসব জ্বালানির দামও দ্রুত বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবার ঘরের তাপমাত্রা কমিয়ে কিংবা অন্যান্য ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিশ্বব্যাপী চাহিদাও কমার আশঙ্কা
ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় জ্বালানি সরবরাহ সংকটের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। একই সঙ্গে সেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতিমালা দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন সম্প্রতি পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছরে বৈশ্বিক তেল ব্যবহার বাড়ার পরিবর্তে কমতে পারে। এর পেছনে রয়েছে উচ্চ মূল্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিকল্প প্রযুক্তির প্রসার।
অনেক মার্কিন ভোক্তার মতে, পেট্রোলের দাম কমলেও তারা আগের জীবনধারায় পুরোপুরি ফিরবেন না। কারণ জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে বাড়তি খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, বীমা এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও অনেক বেশি।
ইরান যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া এই নতুন বাস্তবতা তাই শুধু সাময়িক মূল্যবৃদ্ধির গল্প নয়; এটি আমেরিকার দীর্ঘদিনের জ্বালানি ব্যবহারের ধরণেও স্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের পর উচ্চ জ্বালানি মূল্য আমেরিকানদের গাড়ি ব্যবহার ও কেনার অভ্যাস বদলে দিচ্ছে, কমছে পেট্রোলের চাহিদা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















