চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর দালিয়ানে শুরু হয়েছে বহুল আলোচিত গ্রীষ্মকালীন দাভোস সম্মেলন। বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে আয়োজিত এই বৈশ্বিক ফোরামে এবার ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ৭০০ প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো “বৃহৎ পরিসরে উদ্ভাবন”, যা শুধু নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেই উদ্ভাবনকে সমাজ ও অর্থনীতিতে বাস্তব পরিবর্তনের শক্তিতে রূপান্তরের ওপর জোর দেয়।
উদ্ভাবনের নতুন সংজ্ঞা
বিশ্বজুড়ে উদ্ভাবন নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে এবার “বৃহৎ পরিসরে” শব্দটি যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর অর্থ হলো এমন উদ্ভাবন, যা শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং ব্যাপক প্রয়োগের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উপকারে আসে।
চীনের অর্থনৈতিক উত্থানকে এই ধারণার একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটি শুধু প্রযুক্তি উদ্ভাবনেই এগোয়নি, বরং দ্রুত সেই প্রযুক্তিকে উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তর করেছে। বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, শক্তিশালী শিল্পভিত্তি এবং উন্মুক্ত উদ্ভাবনী পরিবেশ এই সাফল্যের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
বিশ্বের উদ্ভাবনকেন্দ্র হিসেবে চীনের উত্থান
এক সময় বিশ্ব কারখানা হিসেবে পরিচিত চীন গত এক দশকে নিজেকে বৈশ্বিক উদ্ভাবনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নতুন জ্বালানিচালিত যানবাহনের বাজার গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশটি সবুজ অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
একই সঙ্গে স্মার্ট উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি এবং আধুনিক কৃষি খাতে ব্যাপক প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন নতুন শিল্পখাতের বিকাশ ঘটেছে। গবেষণাগার থেকে বাজার পর্যন্ত উদ্ভাবনের পুরো যাত্রাপথকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করার এই সক্ষমতা বিশ্বের অনেক দেশের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
সহযোগিতার নতুন সুযোগ
সম্মেলনে চীনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো উদ্ভাবনের সুফল অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তুতি। প্রযুক্তিকে কেবল প্রতিযোগিতা বা আধিপত্যের হাতিয়ার হিসেবে না দেখে উন্নয়ন ও সহযোগিতার মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ইউরোপে নতুন জ্বালানিচালিত যানবাহনের সরবরাহব্যবস্থা, লাতিন আমেরিকায় ডিজিটাল অর্থনীতি ও সবুজ প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক অংশীদারত্ব এই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
চীনের মতে, বৃহৎ পরিসরের উদ্ভাবন বিশ্বের জন্য অস্থিরতা নয়, বরং নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এটি কোনো দেশকে বাদ দেওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি মানুষ ও অর্থনীতিকে ক্ষমতায়নের পথ খুলে দিতে সক্ষম।
দুই দশকের পথচলার মূল্যায়ন
২০০৭ সালে গ্রীষ্মকালীন দাভোস প্রথমবার চীনে আয়োজনের সময় অনেকেই এটিকে দেশের সাফল্য প্রদর্শনের একটি মঞ্চ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু প্রায় দুই দশক পর চীন এখন শুধু বিশ্বায়নের সুবিধাভোগী নয়, বরং বৈশ্বিক উদ্ভাবন ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশাল বাজার, পূর্ণাঙ্গ শিল্পব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চীন দেখাতে চায় যে উদ্ভাবনকে বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগ করা সম্ভব। আর সেই প্রয়োগই বৈশ্বিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
গ্রীষ্মকালীন দাভোসে চীনের এই বার্তা তাই শুধু নিজস্ব সাফল্যের গল্প নয়, বরং উদ্ভাবনকে বৈশ্বিক উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে রূপান্তরের একটি বৃহত্তর আহ্বান হিসেবেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
চীনের গ্রীষ্মকালীন দাভোস সম্মেলনে ‘বৃহৎ পরিসরে উদ্ভাবন’ ধারণা বিশ্ব অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের বার্তা দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















