যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দিতে এক ঐতিহাসিক প্রস্তাব অনুমোদন করেছে দেশটির সিনেট। এর আগে একই প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদেও পাস হয়েছিল। ফলে ১৯৭৩ সালের যুদ্ধক্ষমতা আইন কার্যকর হওয়ার পর এই প্রথম কংগ্রেসের উভয় কক্ষ কোনো প্রেসিডেন্টকে সামরিক সংঘাত থেকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে একমত হলো।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ভোটে সিনেটে প্রস্তাবটি ৫০-৪৮ ভোটে পাস হয়। এতে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটরও সমর্থন দেন। এই ভোটকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুদ্ধ নিয়ে বাড়ছে অসন্তোষ
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরান সংঘাতের সূচনা হয়। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যয়, ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, খুব অল্পসংখ্যক মার্কিন নাগরিক মনে করেন যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের খরচ যৌক্তিক ছিল। একই সঙ্গে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, তেহরানের সঙ্গে বর্তমান যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের ভেতরেও বিরোধিতা বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
ভোটের পর ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে প্রস্তাবটির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি এটিকে “অর্থহীন” এবং “ভুল সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত” বলে আখ্যা দেন। তার দাবি, এই ধরনের পদক্ষেপ ইরানকে উৎসাহিত করবে এবং শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল করতে পারে।
হোয়াইট হাউসও জানিয়েছে, প্রস্তাবটির বাস্তব কোনো আইনি প্রভাব নেই। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সামরিক অভিযান ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে।
আইনি জটিলতা রয়ে গেছে
যদিও কংগ্রেসের উভয় কক্ষ প্রস্তাবটি পাস করেছে, তবুও এর আইনি কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। যুদ্ধক্ষমতা আইনের অধীনে এমন প্রস্তাব সরাসরি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানোর প্রয়োজন নেই।
তবে অতীতের এক সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, কংগ্রেসের কোনো সিদ্ধান্ত আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে প্রেসিডেন্টের অনুমোদন বা ভেটোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে। ফলে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালতের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

কংগ্রেস বনাম প্রেসিডেন্ট
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা যুক্তি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা বা সামরিক সংঘাতে জড়ানোর ক্ষমতা মূলত কংগ্রেসের হাতে। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্তে কংগ্রেসকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
প্রস্তাবটির সমর্থকেরা বলছেন, এটি শুধু একটি রাজনৈতিক বার্তা নয়; বরং প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতার ওপর কংগ্রেসের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব পুনর্ব্যক্ত করার প্রচেষ্টা।
সামনের চ্যালেঞ্জ
ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। কংগ্রেসের এই ভোট সেই আলোচনায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ইরান নিয়ে কোনো নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে প্রশাসনকে আরও বেশি রাজনৈতিক ও আইনি বাধার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটের তাৎপর্য শুধু ইরান নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















