বিশ্বকাপ ফুটবল সাধারণত কয়েক সপ্তাহের উৎসব। কিন্তু ইংল্যান্ডের একদল ফুটবল সমর্থকের জন্য ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ শেষ হতে লেগেছে চার দশক। মেক্সিকো বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে তারা এমন এক যাত্রা শুরু করেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তাদের স্থায়ীভাবে উত্তর আমেরিকায় বসতি গড়ার পথে নিয়ে যায়।
ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের স্টাওরব্রিজ এলাকার একদল তরুণ বন্ধু, যারা নিজেদের ‘ডিস্কো ফার্ম’ নামে পরিচয় দিতেন, ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপ দেখতে রওনা হন। তখন তাদের বয়স ছিল ২০ থেকে ২৩ বছরের মধ্যে। চাকরি হারানোর পর তারা জীবনের নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সফরই তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
বিশ্বকাপের সফর থেকে নতুন জীবনের শুরু
বন্ধুরা প্রথমে ট্রেনে করে বার্মিংহাম, সেখান থেকে গ্যাটউইক বিমানবন্দর এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস হয়ে মেক্সিকোতে পৌঁছান। ইংল্যান্ডের প্রথম ম্যাচ দেখতে তারা যান মনতেরেতে।
মেক্সিকো তখন তাদের কাছে ছিল এক রহস্যময় ও দূরদেশ। স্থানীয় ভাষা কী, সেটাও অনেকের জানা ছিল না। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তারা শত শত ইংলিশ সমর্থকের সঙ্গে মিশে যান। অল্প খরচে হোটেলে থাকা, সস্তায় খাবার ও পানীয় উপভোগ করা এবং বিশ্বকাপের উন্মাদনায় মেতে ওঠা ছিল তাদের প্রতিদিনের রুটিন।
এক পর্যায়ে প্রকাশ্যে শার্ট ছাড়া ঘোরাঘুরি এবং রাস্তায় বিয়ার পান করার কারণে তাদের গ্রেপ্তারও হতে হয়। তবু সেই অভিজ্ঞতা তাদের উৎসাহ কমাতে পারেনি।
টেক্সাসে দেখা নতুন সম্ভাবনা
বিশ্বকাপ চলাকালেই তারা টেক্সাসে সময় কাটানোর সুযোগ পান। সেখানকার জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সামাজিক পরিবেশ তাদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।
দলের অন্যতম সদস্য গ্যারি অ্যালেন জানান, যুক্তরাষ্ট্রে তারা এমন সুযোগ দেখেছিলেন যা সে সময় ব্রিটেনে কল্পনা করাও কঠিন ছিল। উন্নত অবকাঠামো, কাজের সুযোগ, খেলাধুলার পরিবেশ, বিনোদনের ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তারা।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর অনেকের হাতে থাকা অর্থ প্রায় ফুরিয়ে গেলেও দেশে ফেরার বদলে তারা টেক্সাসের সাউথ পাদ্রে দ্বীপে কাজ খুঁজতে যান। সেখানেই তাদের পরিচয় হয় স্টিভ ডসনের সঙ্গে, যিনি পরবর্তীতে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
নতুন দেশে প্রতিষ্ঠা
ডেভিড আর্নল্ড মেক্সিকোর মনতেরেতে থেকে যান এবং পরে একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হন। অন্যদিকে গ্যারি অ্যালেন, গ্যারি হার্ডউইক এবং স্টুয়ার্ট বেটস যুক্তরাষ্ট্রে থেকে বিভিন্ন কাজ শুরু করেন।

তারা একসময় কোকা-কোলার জন্য ইনস্টলেশন ক্রু হিসেবে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সিনেমা হল ও থিয়েটারে পানীয় সরবরাহ ব্যবস্থার যন্ত্রপাতি স্থাপনের দায়িত্ব পালন করতেন তারা।
গ্যারি অ্যালেন ১৯৮৬ সালের বড়দিনে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য যুক্তরাজ্যে ফিরেছিলেন। তবে পরিবার তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। পরে তিনি আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান এবং সেখানেই জীবন গড়ে তোলেন।
৪০ বছর পরও অটুট বন্ধন
চার দশক পেরিয়ে গেলেও সেই বন্ধুত্ব এবং ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা অটুট রয়েছে। বন্ধুরা এখনও ইংল্যান্ড দলের খেলা অনুসরণ করেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে একত্রিত হন।
এ বছর বিশ্বকাপ উপলক্ষে তারা আবারও টেক্সাস ও মেক্সিকোতে পুনর্মিলনীর আয়োজন করেছেন। ১৯৮৬ সালের সেই সফরের স্মৃতি নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘লস্ট ডাউন মেক্সিকো ওয়ে’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্রও।
বর্তমানে ৬২ বছর বয়সী গ্যারি অ্যালেন মনে করেন, সময় বদলেছে, খরচ বেড়েছে, শহরগুলোও অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু ইংল্যান্ড সমর্থকদের আবেগ ও উৎসবের আমেজ আগের মতোই রয়েছে।
তার ভাষায়, ১৯৮৬ হোক কিংবা ২০২৬—ফুটবল, বন্ধুত্ব আর আনন্দ উদযাপনের সেই চেতনায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।
মেক্সিকো বিশ্বকাপের সফর থেকে শুরু হওয়া এই গল্প শুধু ফুটবলপ্রেমের নয়; এটি একদল তরুণের সাহসী সিদ্ধান্ত, নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন এবং চার দশক ধরে টিকে থাকা বন্ধুত্বেরও গল্প।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















