০৪:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
নেপথ্যের ‘গুরু’, গোপন বার্তা ও তুলসি গ্যাবার্ডের রাজনৈতিক উত্থান ঘিরে ওয়াশিংটন পোস্টের বিস্ফোরক অনুসন্ধান যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ফুটবল নায়ক অ্যালেক্স ফ্রিম্যানের উত্থান দিনাজপুর সীমান্তে ‘বাংলাদেশে পুশইন’ অভিযোগ, একই পরিবারের চার সদস্য আটক ঢাকায় সাংবাদিক পরিচয়ে রিকশাচালকদের কাছ থেকে টাকা আদায়, যুবক আটক হামে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, বাংলাদেশে হামে প্রাণহানি বেড়ে ৬৮৯ নিয়োগের চার মাস পর পদত্যাগ, জামায়াতপন্থি আইন কর্মকর্তাদের ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি’ বললেন ব্যারিস্টার বাদল ইরান যুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতি: শক্তির দম্ভ থেকে কূটনীতির সম্ভাবনার দিকে? বাংলাদেশের ভারসাম্যের কূটনীতি: দিল্লি না বেইজিং? শহরের রেলপথে ইতিহাসের চলমান পাঠশালা মস্তিষ্কের ব্যায়াম ছেড়ে দেবেন না: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আমাদের চিন্তার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে?

বাংলাদেশের ভারসাম্যের কূটনীতি: দিল্লি না বেইজিং?

চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে সোমবার রাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেওয়া লালগালিচা সংবর্ধনা ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, এর পেছনে ছিল আরও গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য।

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং উন্নয়ন অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎস। তারেক রহমানের এই সফরে একাধিক প্রকল্প নিয়ে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি চীনের নেতৃত্বের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে জে-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সফরের সূচি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে প্রথমে কুয়ালালামপুর, এরপর দালিয়ানে একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং তারপর বেইজিংয়ে মূল বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে নয়াদিল্লির প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, কারণ ভারতও বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব (পূর্ব) রিভা গাঙ্গুলি দাস ইউএনআইকে বলেন, “চীন এই সফরকে কীভাবে উপস্থাপন করে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে কী বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, চলতি বছরের শেষ দিকে তারেক রহমানের দিল্লি সফরেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

Riva Ganguly Das - CSDR

কূটনীতিকদের মতে, সফরের এই ক্রম শুধু দিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা নয়; বরং এটি “বাংলাদেশ ফার্স্ট” পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন, যেখানে ঢাকা বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় এবং কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না।

তবে এই সফরের গুরুত্ব শুধু প্রতীকী নয়, এর পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা।

বাংলাদেশ বর্তমানে চীনের কাছ থেকে সরাসরি ৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ও নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো চীন-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের প্রকল্প প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে।

আলোচনাধীন প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় একটি চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা।

আনোয়ারা শিল্পাঞ্চলে সড়ক, বন্দর সুবিধা, ইউটিলিটি নেটওয়ার্ক এবং বহুতল কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

চীন ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের কাছে বাংলাদেশের জন্য একটি নৌঘাঁটি নির্মাণে সহায়তা করেছে। এখন তারা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলায়ও প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী। কারণ চীনের সহায়তায় নির্মিত পায়রা বন্দরের কার্যকারিতা জলপথ-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হয়নি।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রে অবস্থিত দুটি বন্দরে বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন এ অঞ্চলে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

চট্টগ্রামে পৌঁছেছে চীনা নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ

এই সফর থেকে বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাংকিং সহযোগিতা এবং সম্ভাব্য মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ) ব্যবস্থাসহ প্রায় এক ডজন চুক্তি হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্থনৈতিক নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশ ২.২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২০টি চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই ক্রয় সম্পন্ন হলে কয়েক দশকের মধ্যে এটি হবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সবচেয়ে বড় আধুনিকায়ন উদ্যোগ এবং পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্ল্যাটফর্মের দ্বিতীয় ব্যবহারকারী।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো প্রত্যক্ষ সামরিক হুমকির মুখে না থেকেও বাংলাদেশ কেন এত ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান কিনতে আগ্রহী। তবে তারা স্বীকার করেছেন, আধুনিক রাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ধরনের চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রতিটি গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

তাদের মতে, এই ক্রয়ের ফলে বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রশিক্ষণ ও রসদ-সহযোগিতাও আরও গভীর হবে।

বাংলাদেশ ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। মূল ভূখণ্ড ভারতের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের একমাত্র স্থলপথ হওয়ায় এ অঞ্চল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে চীনা প্রযুক্তির উন্নত যুদ্ধবিমান এবং চীন-পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা ভারতের নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কিছুটা শীতল হয়ে পড়েছে। বাণিজ্য, ভিসা, প্রত্যর্পণ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতবিরোধের কারণে উভয় দেশের মধ্যে কিছুটা অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, যা হাসিনা আমলে তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

Roar বাংলা - শিলিগুড়ি করিডোর: ভারতের 'চিকেন নেক'

তবে ভারত ও বাংলাদেশের কূটনীতিকরা আশা করছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে।

অন্যদিকে, ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলের একটি অধ্যায়ও রয়েছে, যখন দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল। সে সময় ভারত অভিযোগ করেছিল, বাংলাদেশের মাটিতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য আশ্রয় ও প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে যেন কৌশলগত জোট হিসেবে দেখা না হয়।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা জানেন, দেশের সমৃদ্ধি নির্ভর করে এশিয়ার দুই উদীয়মান শক্তি—চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর। চীন উন্নয়ন অর্থায়ন ও অবকাঠামো বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ উৎস, অন্যদিকে ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ভারত অপরিহার্য।

অতএব, তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের সাফল্য কেবল বেইজিংয়ে কতগুলো সমঝোতা স্মারক সই হলো তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং ঢাকা কতটা সফলভাবে চীন ও ভারত উভয়কেই বোঝাতে পারে যে এক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক অন্য পক্ষের ক্ষতির বিনিময়ে নয়—সেই বিষয়টিই হবে প্রকৃত মাপকাঠি।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপথ্যের ‘গুরু’, গোপন বার্তা ও তুলসি গ্যাবার্ডের রাজনৈতিক উত্থান ঘিরে ওয়াশিংটন পোস্টের বিস্ফোরক অনুসন্ধান

বাংলাদেশের ভারসাম্যের কূটনীতি: দিল্লি না বেইজিং?

০২:৪৬:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে সোমবার রাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেওয়া লালগালিচা সংবর্ধনা ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, এর পেছনে ছিল আরও গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য।

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং উন্নয়ন অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎস। তারেক রহমানের এই সফরে একাধিক প্রকল্প নিয়ে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি চীনের নেতৃত্বের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে জে-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সফরের সূচি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে প্রথমে কুয়ালালামপুর, এরপর দালিয়ানে একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং তারপর বেইজিংয়ে মূল বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে নয়াদিল্লির প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, কারণ ভারতও বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব (পূর্ব) রিভা গাঙ্গুলি দাস ইউএনআইকে বলেন, “চীন এই সফরকে কীভাবে উপস্থাপন করে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে কী বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, চলতি বছরের শেষ দিকে তারেক রহমানের দিল্লি সফরেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

Riva Ganguly Das - CSDR

কূটনীতিকদের মতে, সফরের এই ক্রম শুধু দিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা নয়; বরং এটি “বাংলাদেশ ফার্স্ট” পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন, যেখানে ঢাকা বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় এবং কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না।

তবে এই সফরের গুরুত্ব শুধু প্রতীকী নয়, এর পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা।

বাংলাদেশ বর্তমানে চীনের কাছ থেকে সরাসরি ৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ও নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো চীন-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের প্রকল্প প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে।

আলোচনাধীন প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় একটি চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা।

আনোয়ারা শিল্পাঞ্চলে সড়ক, বন্দর সুবিধা, ইউটিলিটি নেটওয়ার্ক এবং বহুতল কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

চীন ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের কাছে বাংলাদেশের জন্য একটি নৌঘাঁটি নির্মাণে সহায়তা করেছে। এখন তারা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলায়ও প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী। কারণ চীনের সহায়তায় নির্মিত পায়রা বন্দরের কার্যকারিতা জলপথ-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হয়নি।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রে অবস্থিত দুটি বন্দরে বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন এ অঞ্চলে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

চট্টগ্রামে পৌঁছেছে চীনা নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ

এই সফর থেকে বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাংকিং সহযোগিতা এবং সম্ভাব্য মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ) ব্যবস্থাসহ প্রায় এক ডজন চুক্তি হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্থনৈতিক নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশ ২.২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২০টি চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই ক্রয় সম্পন্ন হলে কয়েক দশকের মধ্যে এটি হবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সবচেয়ে বড় আধুনিকায়ন উদ্যোগ এবং পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্ল্যাটফর্মের দ্বিতীয় ব্যবহারকারী।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো প্রত্যক্ষ সামরিক হুমকির মুখে না থেকেও বাংলাদেশ কেন এত ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান কিনতে আগ্রহী। তবে তারা স্বীকার করেছেন, আধুনিক রাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ধরনের চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রতিটি গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

তাদের মতে, এই ক্রয়ের ফলে বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রশিক্ষণ ও রসদ-সহযোগিতাও আরও গভীর হবে।

বাংলাদেশ ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। মূল ভূখণ্ড ভারতের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের একমাত্র স্থলপথ হওয়ায় এ অঞ্চল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে চীনা প্রযুক্তির উন্নত যুদ্ধবিমান এবং চীন-পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা ভারতের নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কিছুটা শীতল হয়ে পড়েছে। বাণিজ্য, ভিসা, প্রত্যর্পণ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতবিরোধের কারণে উভয় দেশের মধ্যে কিছুটা অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, যা হাসিনা আমলে তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

Roar বাংলা - শিলিগুড়ি করিডোর: ভারতের 'চিকেন নেক'

তবে ভারত ও বাংলাদেশের কূটনীতিকরা আশা করছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে।

অন্যদিকে, ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলের একটি অধ্যায়ও রয়েছে, যখন দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল। সে সময় ভারত অভিযোগ করেছিল, বাংলাদেশের মাটিতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য আশ্রয় ও প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে যেন কৌশলগত জোট হিসেবে দেখা না হয়।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা জানেন, দেশের সমৃদ্ধি নির্ভর করে এশিয়ার দুই উদীয়মান শক্তি—চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর। চীন উন্নয়ন অর্থায়ন ও অবকাঠামো বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ উৎস, অন্যদিকে ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ভারত অপরিহার্য।

অতএব, তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের সাফল্য কেবল বেইজিংয়ে কতগুলো সমঝোতা স্মারক সই হলো তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং ঢাকা কতটা সফলভাবে চীন ও ভারত উভয়কেই বোঝাতে পারে যে এক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক অন্য পক্ষের ক্ষতির বিনিময়ে নয়—সেই বিষয়টিই হবে প্রকৃত মাপকাঠি।