মার্কিন রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব তুলসি গ্যাবার্ডের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কি আড়াল থেকে পরিচালিত হয়েছে? যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টের দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গ্যাবার্ডের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে ঘিরে গোপন নির্দেশনা, কৌশলগত পরামর্শ এবং সমন্বিত অনলাইন প্রচারণার একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তার আধ্যাত্মিক গুরু ক্রিস বাটলার।
গোপন নথির খোঁজ
প্রতিবেদনের সূত্রপাত রেবেকা সল্টজবার্গ নামের এক সাবেক সহযোগীর মাধ্যমে। তিনি একসময় গ্যাবার্ডের নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করেছেন এবং একই সঙ্গে বাটলারের প্রতিষ্ঠিত ‘সায়েন্স অব আইডেন্টিটি ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে সংগঠনের নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার পর তিনি সাংবাদিকদের কাছে বিপুল পরিমাণ ইমেইল, মেমো ও নথি সরবরাহ করেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের দাবি, এসব নথির পরিমাণ ২৫ হাজার পৃষ্ঠারও বেশি। সেখানে ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে গ্যাবার্ডের জন্য তৈরি করা শত শত পরামর্শমূলক মেমো পাওয়া যায়। এসব নথিতে আইন প্রণয়ন, নীতিগত অবস্থান, টেলিভিশন সাক্ষাৎকার এবং জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে।

নির্দেশনা ও বাস্তব পদক্ষেপের মিল
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে মেমোগুলোর নির্দেশনার সঙ্গে গ্যাবার্ডের পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘনিষ্ঠ মিল পাওয়া গেছে। কিছু মেমোতে নির্দিষ্ট আইন প্রস্তাবের সুপারিশ করা হয়েছিল, যা পরে তিনি কংগ্রেসে উত্থাপন করেন। আবার টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের জন্য প্রস্তুত করা বক্তব্যের ভাষাও অনেক ক্ষেত্রে তার প্রকাশ্য মন্তব্যের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যায়।
ওয়াশিংটন পোস্ট ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে গ্যাবার্ডের ৩২টি টেলিভিশন সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে। তাদের দাবি, ২৪টি ক্ষেত্রে তিনি মেমোতে দেওয়া ভাষা প্রায় শব্দে-শব্দে ব্যবহার করেছেন। বাকি সাক্ষাৎকারগুলোতেও একই ধরনের মূল বার্তা অনুসরণ করা হয়েছে।
গুরু না উপদেষ্টা?
ক্রিস বাটলার দীর্ঘদিন ধরে হাওয়াইভিত্তিক আধ্যাত্মিক সংগঠন সায়েন্স অব আইডেন্টিটি ফাউন্ডেশনের নেতা। তার অনুসারীরা কৃষ্ণভক্তি-ভিত্তিক হিন্দু দর্শন অনুসরণ করেন। তবে সংগঠনটির সাবেক কিছু সদস্য একে ‘কাল্ট’ বা গোপনীয় ও নিয়ন্ত্রণমূলক গোষ্ঠী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সংগঠনটি অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গ্যাবার্ড অতীতে একাধিকবার বলেছেন, বাটলার তার রাজনৈতিক পরামর্শদাতা নন। বাটলারও প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, তিনি কখনও গ্যাবার্ডকে কংগ্রেসে কীভাবে ভোট দিতে হবে তা বলেননি। কিন্তু ফাঁস হওয়া নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য সেই অবস্থানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত প্রচারণার অভিযোগ
প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে গ্যাবার্ডকে সমর্থন দিতে ছদ্মনাম ব্যবহার করে পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে দেখা যায়, একদল কর্মী ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে অনলাইন মন্তব্য, পোস্ট এবং প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে গ্যাবার্ডের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করতেন।
এমনকি কিছু বার্তায় গ্যাবার্ড নিজেও আলোচিত বিষয়গুলোর জবাব কীভাবে দেওয়া উচিত সে বিষয়ে মতামত দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
গ্যাবার্ডের ঘনিষ্ঠরা প্রতিবেদনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই অনুসন্ধান মূলত তার হিন্দু ধর্মবিশ্বাসকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে এবং এতে ধর্মীয় বিদ্বেষের উপাদান রয়েছে। অন্যদিকে সায়েন্স অব আইডেন্টিটি ফাউন্ডেশনও অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।
তবে ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধান নতুন করে আলোচনায় এনেছে মার্কিন রাজনীতিতে ধর্মীয় নেটওয়ার্ক, ব্যক্তিগত প্রভাব এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অদৃশ্য সম্পর্কের প্রশ্ন। বিশেষ করে এমন একজন রাজনীতিককে ঘিরে, যিনি ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য থেকে শুরু করে রিপাবলিকান ঘরানার গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা পর্যন্ত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















