ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল দ্রুত সাফল্যের প্রত্যাশা নিয়ে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংঘাতের যে পরিণতি ঘটেছে, তা ওয়াশিংটনের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে খুব একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সামরিক শক্তির প্রদর্শন ঘটলেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল আসেনি। ফলে এই সংঘাতকে শুধু একটি ব্যর্থ অভিযান হিসেবে দেখলেই পুরো চিত্র ধরা পড়ে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির কিছু মৌলিক বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
নিশ্চয়ই যুদ্ধটি বিপুল মানবিক ক্ষতি ও আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার পর্যন্ত এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই সংঘাত এমন একটি বার্তাও দিয়েছে, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায় অনুপস্থিত ছিল—সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সব সময় রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করে না।
যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইরান যদি এই সংঘাতকে টিকে থাকার সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারে, তাহলে দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব আরও বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী হলে তেহরানের কৌশলগত পরিসর বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

দ্বিতীয়ত, এই যুদ্ধ চীনের অবস্থানকে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী করেছে। যখন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক দেশ একতরফা শক্তি প্রয়োগকারী হিসেবে দেখেছে, তখন বেইজিং নিজেকে স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক নিয়মের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। যদিও চীনের নিজের ভূরাজনৈতিক আচরণ নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে, তবু বর্তমান বাস্তবতায় তার কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তৃতীয়ত, রাশিয়াও সাময়িক কিছু সুবিধা পেয়েছে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধি মস্কোর অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের চাপে থাকা রুশ অর্থনীতির জন্য এটি এক ধরনের অন্তর্বর্তী আর্থিক সহায়তা হিসেবে কাজ করেছে।
তবে কেবল ঝুঁকির দিক দেখলে এই সংঘাতের পূর্ণ মূল্যায়ন করা হবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও উন্মোচন করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চেয়েছিল, তার রাজনৈতিক মূল্য এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধের জনপ্রিয়তা সীমিত ছিল এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামরিক উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউসকে আরও সতর্ক হতে হতে পারে।
ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের দৃঢ় সমর্থনের ওপর নির্ভর করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশল পরিচালনা করা হলেও এখন সেই সমীকরণ আগের মতো নিশ্চিত নয়। মার্কিন জনমতের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক বিভাজন ইসরায়েলি নেতৃত্বের জন্য নতুন সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে।
অন্যদিকে ইউরোপ এই সংকট থেকে এক ধরনের অপ্রত্যাশিত কূটনৈতিক সুযোগ পেয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতা আবারও সামনে এলেও ইউরোপীয় দেশগুলো অন্তত একটি বিষয়ে ঐক্য দেখিয়েছে—তারা ওয়াশিংটনের প্রতিটি অবস্থানের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করেনি। ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের সমন্বিত অবস্থান ইউরোপকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও স্বাধীন কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ দিয়েছে।
এখানেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। বিশ্ব কি আবার দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে আটকে যাবে, নাকি মধ্যম শক্তিগুলো আরও বড় ভূমিকা নিতে পারবে?
বর্তমান পরিস্থিতি দ্বিতীয় সম্ভাবনার জন্য কিছু জায়গা তৈরি করেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশ দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রত্যাশা করে এসেছে, যেখানে সিদ্ধান্ত কেবল ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে না। ইউরোপ যদি সেই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক পরিসর গড়ে তুলতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
অবশ্য আশাবাদের পাশাপাশি বাস্তবতাও মনে রাখতে হবে। ইরানের সঙ্গে স্থায়ী সমঝোতা সহজ হবে না। চীনের উত্থান নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর একটি মৌলিক শিক্ষা রয়েছে। শক্তির প্রদর্শন যতই নাটকীয় হোক, শেষ পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান আসে রাজনৈতিক সমঝোতা, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে। যদি ইরান যুদ্ধের ব্যর্থতা বিশ্বনেতাদের সেই সত্যটি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়, তাহলে এই ব্যয়বহুল সংঘাতের মধ্য থেকেও কিছু ইতিবাচক ফল বেরিয়ে আসতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—সামরিক ক্ষমতা আর আগের মতো অবাধ নয়, আর কূটনীতির প্রয়োজনীয়তাও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
হুগো ডিক্সন 


















