০৪:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
নেপথ্যের ‘গুরু’, গোপন বার্তা ও তুলসি গ্যাবার্ডের রাজনৈতিক উত্থান ঘিরে ওয়াশিংটন পোস্টের বিস্ফোরক অনুসন্ধান যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ফুটবল নায়ক অ্যালেক্স ফ্রিম্যানের উত্থান দিনাজপুর সীমান্তে ‘বাংলাদেশে পুশইন’ অভিযোগ, একই পরিবারের চার সদস্য আটক ঢাকায় সাংবাদিক পরিচয়ে রিকশাচালকদের কাছ থেকে টাকা আদায়, যুবক আটক হামে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, বাংলাদেশে হামে প্রাণহানি বেড়ে ৬৮৯ নিয়োগের চার মাস পর পদত্যাগ, জামায়াতপন্থি আইন কর্মকর্তাদের ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি’ বললেন ব্যারিস্টার বাদল ইরান যুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতি: শক্তির দম্ভ থেকে কূটনীতির সম্ভাবনার দিকে? বাংলাদেশের ভারসাম্যের কূটনীতি: দিল্লি না বেইজিং? শহরের রেলপথে ইতিহাসের চলমান পাঠশালা মস্তিষ্কের ব্যায়াম ছেড়ে দেবেন না: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আমাদের চিন্তার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে?

মস্তিষ্কের ব্যায়াম ছেড়ে দেবেন না: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আমাদের চিন্তার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা এখন আর শুধু প্রযুক্তির সীমায় আবদ্ধ নয়। এটি শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, সৃজনশীলতা এবং মানবিক দক্ষতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে লেখালেখির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার এমন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে—লেখার কাজ যদি যন্ত্রের হাতে তুলে দিই, তাহলে কি আমরা চিন্তার একটি মৌলিক মানবিক ক্ষমতাও হারাতে বসেছি?

লেখা কেন শুধু লেখা নয়

মানুষের ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ে লেখালেখি ছিল সীমিত একটি দক্ষতা। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় লেখা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি শেখা, বোঝা এবং চিন্তা গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া।

সাম্প্রতিক স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণা দেখিয়েছে, যখন একজন মানুষ নিজের ভাষায় কিছু লেখে, তখন মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একযোগে সক্রিয় হয়। ভাষা, স্মৃতি, দৃষ্টিগ্রাহ্য তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, মনোযোগ এবং শারীরিক সমন্বয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত অঞ্চলগুলো পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। ফলে লেখালেখি শুধু ভাবনাকে কাগজে তোলা নয়; বরং এটি মস্তিষ্কের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যায়াম।

গবেষণায় দেখা গেছে, হাতে লেখার সময় এই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয়। নরওয়ের গবেষকেরা ২০২৪ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ কম্পিউটারে টাইপ করার তুলনায় বেশি সক্রিয় থাকে। এই ধরনের সংযোগ নতুন তথ্য শেখা এবং দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

Remember How to Think? Let's Not Lose That to AI: Easy Habits to Train Your  Brain

শিশুদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। চীনে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত হাতে চীনা অক্ষর লেখে, তাদের মস্তিষ্কে ভাষা ও দৃষ্টিগত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে জড়িত অংশগুলো বেশি সক্রিয় থাকে। ফলে তারা অক্ষর শনাক্ত ও পড়ার ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে দক্ষ হয়ে ওঠে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমন এবং নতুন বাস্তবতা

২০২২ সালের শেষ দিকে চ্যাটজিপিটি আত্মপ্রকাশের পর লেখালেখির জগতে বড় পরিবর্তন শুরু হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, করপোরেট অফিস এবং ব্যক্তিগত জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর লেখার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ অ্যাসাইনমেন্ট বা বাড়ির কাজের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। অনলাইনে প্রকাশিত নতুন বিষয়বস্তুর উল্লেখযোগ্য অংশও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি চাকরির আবেদনপত্র, ব্যবসায়িক ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা অনলাইন পরিচিতি তৈরিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।

এই জনপ্রিয়তার কারণ স্পষ্ট। লেখা কঠিন কাজ। অনেক মানুষ লেখার প্রক্রিয়াকে সময়সাপেক্ষ এবং শ্রমসাধ্য মনে করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই কঠিন কাজকে কয়েক সেকেন্ডে সহজ করে দিচ্ছে।

কিন্তু সুবিধার আড়ালে কী হারাচ্ছি?

প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন যন্ত্র মানুষের শ্রম কমিয়েছে। কাপড় ধোয়ার যন্ত্র গৃহস্থালির কাজ সহজ করেছে, গণনাযন্ত্র দ্রুত হিসাব করতে সাহায্য করেছে, পথনির্দেশক প্রযুক্তি গন্তব্য খুঁজে দিয়েছে। কিন্তু লেখালেখি অন্য ধরনের দক্ষতা।

একটি প্রবন্ধ লিখতে গেলে মানুষকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, বিশ্লেষণ করতে হয়, যুক্তি সাজাতে হয় এবং নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে হয়। অর্থাৎ লেখার মাধ্যমে মানুষ কেবল একটি লেখা তৈরি করে না; সে নিজের চিন্তাকেও গঠন করে।

AI Applications Today: Where Artificial Intelligence is Used | IT Chronicles

এ কারণেই অনেক গবেষক উদ্বিগ্ন। যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের হয়ে এই কাজটি করে দেয়, তাহলে মস্তিষ্কের সেই সক্রিয় অনুশীলন কি কমে যাবে?

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা যায়, যারা কোনো প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া লিখেছেন, তাদের মস্তিষ্কে সবচেয়ে বেশি স্নায়বিক সংযোগ সক্রিয় হয়েছে। সাধারণ অনুসন্ধানযন্ত্র ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে সেই সক্রিয়তা কিছুটা কম ছিল। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই সংযোগ সবচেয়ে দুর্বল দেখা গেছে।

শুধু তা-ই নয়, যারা আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করেছিলেন, পরে সহায়তা ছাড়া লিখতে গিয়েও তাদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। যদিও এই গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভরতার প্রভাব কি সাময়িক, নাকি তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে?

তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু শিশু ও কিশোরদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ লেখালেখির মাধ্যমে তারা শুধু ভাষা শেখে না; তারা যুক্তি গঠন, বিশ্লেষণ, স্মৃতিশক্তি এবং সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায়। যদি শেখার এই পর্যায়েই তারা লেখার বড় অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে তুলে দেয়, তাহলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

Is AI Making Our Brains Weaker?

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো তথ্য সংগ্রহে দক্ষ হবে, কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করে নিজস্ব ভাষায় তা প্রকাশ করার ক্ষমতা আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

সহযোগী হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিকল্প হিসেবে নয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এটি তথ্য যাচাই, গবেষণার উপকরণ সংগ্রহ, যুক্তির দুর্বলতা চিহ্নিত করা বা ভাষাগত সম্পাদনায় মূল্যবান সহায়ক হতে পারে। অনেক পেশাজীবীর জন্য এটি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কার্যকর মাধ্যম।

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি চিন্তার সহকারী না হয়ে চিন্তার বিকল্প হয়ে ওঠে, তখনই সমস্যার সূত্রপাত।

মানুষের মস্তিষ্ক বিকশিত হয়েছে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মাধ্যমে। লেখা সেই চ্যালেঞ্জগুলোর একটি, যা আমাদের ভাবতে, বিশ্লেষণ করতে এবং নিজের চিন্তার সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য করে। সেই মানসিক শ্রম যদি পুরোপুরি প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দিই, তাহলে হয়তো আমরা দ্রুততর ও মসৃণ লেখা পাব, কিন্তু হারাতে পারি গভীর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জন্য লিখতে পারে। কিন্তু মানুষের হয়ে চিন্তা করতে পারে না। আর যদি আমরা নিজেরাই সেই দায়িত্ব ত্যাগ করি, তাহলে একদিন হয়তো দেখব আমাদের কাছে শব্দ আছে, কিন্তু সেই শব্দের পেছনে গড়ে ওঠা চিন্তার শক্তি আর আগের মতো নেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপথ্যের ‘গুরু’, গোপন বার্তা ও তুলসি গ্যাবার্ডের রাজনৈতিক উত্থান ঘিরে ওয়াশিংটন পোস্টের বিস্ফোরক অনুসন্ধান

মস্তিষ্কের ব্যায়াম ছেড়ে দেবেন না: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আমাদের চিন্তার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে?

০২:৩৪:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা এখন আর শুধু প্রযুক্তির সীমায় আবদ্ধ নয়। এটি শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, সৃজনশীলতা এবং মানবিক দক্ষতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে লেখালেখির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার এমন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে—লেখার কাজ যদি যন্ত্রের হাতে তুলে দিই, তাহলে কি আমরা চিন্তার একটি মৌলিক মানবিক ক্ষমতাও হারাতে বসেছি?

লেখা কেন শুধু লেখা নয়

মানুষের ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ে লেখালেখি ছিল সীমিত একটি দক্ষতা। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় লেখা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি শেখা, বোঝা এবং চিন্তা গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া।

সাম্প্রতিক স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণা দেখিয়েছে, যখন একজন মানুষ নিজের ভাষায় কিছু লেখে, তখন মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একযোগে সক্রিয় হয়। ভাষা, স্মৃতি, দৃষ্টিগ্রাহ্য তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, মনোযোগ এবং শারীরিক সমন্বয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত অঞ্চলগুলো পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। ফলে লেখালেখি শুধু ভাবনাকে কাগজে তোলা নয়; বরং এটি মস্তিষ্কের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যায়াম।

গবেষণায় দেখা গেছে, হাতে লেখার সময় এই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয়। নরওয়ের গবেষকেরা ২০২৪ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ কম্পিউটারে টাইপ করার তুলনায় বেশি সক্রিয় থাকে। এই ধরনের সংযোগ নতুন তথ্য শেখা এবং দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

Remember How to Think? Let's Not Lose That to AI: Easy Habits to Train Your  Brain

শিশুদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। চীনে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত হাতে চীনা অক্ষর লেখে, তাদের মস্তিষ্কে ভাষা ও দৃষ্টিগত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে জড়িত অংশগুলো বেশি সক্রিয় থাকে। ফলে তারা অক্ষর শনাক্ত ও পড়ার ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে দক্ষ হয়ে ওঠে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমন এবং নতুন বাস্তবতা

২০২২ সালের শেষ দিকে চ্যাটজিপিটি আত্মপ্রকাশের পর লেখালেখির জগতে বড় পরিবর্তন শুরু হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, করপোরেট অফিস এবং ব্যক্তিগত জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর লেখার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ অ্যাসাইনমেন্ট বা বাড়ির কাজের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। অনলাইনে প্রকাশিত নতুন বিষয়বস্তুর উল্লেখযোগ্য অংশও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি চাকরির আবেদনপত্র, ব্যবসায়িক ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা অনলাইন পরিচিতি তৈরিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।

এই জনপ্রিয়তার কারণ স্পষ্ট। লেখা কঠিন কাজ। অনেক মানুষ লেখার প্রক্রিয়াকে সময়সাপেক্ষ এবং শ্রমসাধ্য মনে করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই কঠিন কাজকে কয়েক সেকেন্ডে সহজ করে দিচ্ছে।

কিন্তু সুবিধার আড়ালে কী হারাচ্ছি?

প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন যন্ত্র মানুষের শ্রম কমিয়েছে। কাপড় ধোয়ার যন্ত্র গৃহস্থালির কাজ সহজ করেছে, গণনাযন্ত্র দ্রুত হিসাব করতে সাহায্য করেছে, পথনির্দেশক প্রযুক্তি গন্তব্য খুঁজে দিয়েছে। কিন্তু লেখালেখি অন্য ধরনের দক্ষতা।

একটি প্রবন্ধ লিখতে গেলে মানুষকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, বিশ্লেষণ করতে হয়, যুক্তি সাজাতে হয় এবং নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে হয়। অর্থাৎ লেখার মাধ্যমে মানুষ কেবল একটি লেখা তৈরি করে না; সে নিজের চিন্তাকেও গঠন করে।

AI Applications Today: Where Artificial Intelligence is Used | IT Chronicles

এ কারণেই অনেক গবেষক উদ্বিগ্ন। যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের হয়ে এই কাজটি করে দেয়, তাহলে মস্তিষ্কের সেই সক্রিয় অনুশীলন কি কমে যাবে?

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা যায়, যারা কোনো প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া লিখেছেন, তাদের মস্তিষ্কে সবচেয়ে বেশি স্নায়বিক সংযোগ সক্রিয় হয়েছে। সাধারণ অনুসন্ধানযন্ত্র ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে সেই সক্রিয়তা কিছুটা কম ছিল। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই সংযোগ সবচেয়ে দুর্বল দেখা গেছে।

শুধু তা-ই নয়, যারা আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করেছিলেন, পরে সহায়তা ছাড়া লিখতে গিয়েও তাদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। যদিও এই গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভরতার প্রভাব কি সাময়িক, নাকি তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে?

তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু শিশু ও কিশোরদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ লেখালেখির মাধ্যমে তারা শুধু ভাষা শেখে না; তারা যুক্তি গঠন, বিশ্লেষণ, স্মৃতিশক্তি এবং সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায়। যদি শেখার এই পর্যায়েই তারা লেখার বড় অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে তুলে দেয়, তাহলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

Is AI Making Our Brains Weaker?

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো তথ্য সংগ্রহে দক্ষ হবে, কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করে নিজস্ব ভাষায় তা প্রকাশ করার ক্ষমতা আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

সহযোগী হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিকল্প হিসেবে নয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এটি তথ্য যাচাই, গবেষণার উপকরণ সংগ্রহ, যুক্তির দুর্বলতা চিহ্নিত করা বা ভাষাগত সম্পাদনায় মূল্যবান সহায়ক হতে পারে। অনেক পেশাজীবীর জন্য এটি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কার্যকর মাধ্যম।

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি চিন্তার সহকারী না হয়ে চিন্তার বিকল্প হয়ে ওঠে, তখনই সমস্যার সূত্রপাত।

মানুষের মস্তিষ্ক বিকশিত হয়েছে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মাধ্যমে। লেখা সেই চ্যালেঞ্জগুলোর একটি, যা আমাদের ভাবতে, বিশ্লেষণ করতে এবং নিজের চিন্তার সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য করে। সেই মানসিক শ্রম যদি পুরোপুরি প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দিই, তাহলে হয়তো আমরা দ্রুততর ও মসৃণ লেখা পাব, কিন্তু হারাতে পারি গভীর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জন্য লিখতে পারে। কিন্তু মানুষের হয়ে চিন্তা করতে পারে না। আর যদি আমরা নিজেরাই সেই দায়িত্ব ত্যাগ করি, তাহলে একদিন হয়তো দেখব আমাদের কাছে শব্দ আছে, কিন্তু সেই শব্দের পেছনে গড়ে ওঠা চিন্তার শক্তি আর আগের মতো নেই।