যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক শান্তি চুক্তি হলেও এর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পরমাণু কর্মসূচি পরিদর্শন, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ ব্যবহারের অধিকার এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডে প্রথম দফার আলোচনা শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শন মেনে নিতে সম্মত হয়েছে। তবে তেহরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, আলোচনায় তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়নি।
পরমাণু ইস্যুতে দ্বন্দ্ব
গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত কাঠামোগত চুক্তিতে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে সম্মতি এলেও ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত আগামী ৬০ দিনের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু ইরান বলছে, এ ধরনের কোনো বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে চুক্তির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশটি নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে বড় ধরনের ফারাক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জব্দ সম্পদ ব্যবহারে ভিন্ন অবস্থান
বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড়ের বিষয়েও মতবিরোধ রয়েছে। ওয়াশিংটনের মতে, মুক্ত হওয়া অর্থ মূলত খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী কেনার কাজে ব্যবহৃত হবে।
অন্যদিকে ইরান বলছে, অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে সে সিদ্ধান্ত নেবে তেহরান নিজেই। এই অবস্থান ভবিষ্যৎ আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল স্বাভাবিক
চুক্তির ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবারও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের বড় একটি অংশ পরিবাহিত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৬০ দিন জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না। তবে পরবর্তী সময়ে টোল বা অন্যান্য ফি আরোপের সম্ভাবনার কথা ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে। এ নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যেও আলোচনা চলছে।
যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে
এদিকে যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিক মনে করেন যুদ্ধের পর ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।
একই সঙ্গে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, যা প্রেসিডেন্টের নীতির প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও এই ভোটের সরাসরি প্রভাব যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
লেবানন ইস্যুতেও অচলাবস্থা
শান্তি চুক্তির আরেকটি জটিল দিক হচ্ছে লেবানন। ইরানের দাবি, চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরায়েলকে লেবানন থেকে সেনা সরিয়ে নিতে হবে। তবে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখবে এবং প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে।
এ অবস্থায় সীমান্ত এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ফলে বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পথ এখনও পুরোপুরি মসৃণ হয়নি।
যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হলেও পরমাণু কর্মসূচি, অর্থ ছাড়, হরমুজ প্রণালি এবং লেবানন প্রশ্নে বিদ্যমান মতবিরোধ শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। আগামী ৬০ দিনের আলোচনা এই চুক্তির টিকে থাকা ও বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















