জাপানে সাম্প্রতিক নির্বাচনে সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির বড় জয়ের পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে দেশটির জনগণ আরও দৃঢ় ও আক্রমণাত্মক নিরাপত্তা নীতির পক্ষে স্পষ্ট সমর্থন দিয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলও যেন সেই ধারণাকে শক্তিশালী করেছিল। নতুন সরকার প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, সংবিধান সংশোধন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার, গুপ্তচরবৃত্তিবিরোধী আইন প্রণয়ন এবং চীনের প্রতি কঠোর অবস্থান নেওয়ার মতো নানা পদক্ষেপ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।
কিন্তু নির্বাচনী বিজয় সবসময় নীতিগত ঐকমত্যের প্রতিফলন নয়। ভোটাররা একটি দলকে ক্ষমতায় আনতে পারে নানা কারণে, অথচ সেই দলের প্রতিটি নীতিকে সমানভাবে সমর্থন নাও করতে পারে। জাপানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্ভবত সেই জটিল সত্যটিই সামনে আনছে।
নিরাপত্তা প্রশ্নে আংশিক সমর্থন
জাপানি জনমতের একটি বড় অংশ সংবিধান সংশোধনের ধারণাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী কাঠামোকে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেকেই অনুভব করছেন। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, কৌশলগত সম্পদ ও সরবরাহব্যবস্থা দেশের নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রশ্নেও জনসমর্থন লক্ষণীয়।
চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ধারণাও ক্রমশ গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। গুপ্তচরবৃত্তিবিরোধী আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও জনগণের উল্লেখযোগ্য সমর্থন দেখা যাচ্ছে। এসব ইঙ্গিত করে যে জাপানি সমাজ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বাস্তবতা সম্পর্কে আগের তুলনায় বেশি সচেতন।
তবে এখানেই গল্প শেষ নয়।
প্রতিরক্ষা ব্যয়ে সংশয়
সরকারের নিরাপত্তা এজেন্ডার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো। কিন্তু এই প্রশ্নে জনমত তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সতর্ক। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সরাসরি সমর্থন বা বিরোধিতা কোনোটিই করছেন না। এই নিরপেক্ষ অবস্থান আসলে অনাগ্রহের নয়; বরং এটি অনিশ্চয়তার প্রতিফলন।
জাপান দীর্ঘদিন ধরে সীমিত সামরিক ভূমিকায় অভ্যস্ত। ফলে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় ধরনের বৃদ্ধি শুধু কৌশলগত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নও উত্থাপন করে। জনগণের একটি অংশ হয়তো নিরাপত্তা হুমকি উপলব্ধি করছে, কিন্তু সেই হুমকির মোকাবিলায় কতটা সামরিক সম্প্রসারণ প্রয়োজন—সেটি নিয়ে এখনও নিশ্চিত নয়।
পারমাণবিক স্মৃতির দীর্ঘ ছায়া
হিরোশিমা ও নাগাসাকির অভিজ্ঞতা জাপানের জাতীয় চেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে পারমাণবিক নীতির ক্ষেত্রে যেকোনো পরিবর্তনের প্রস্তাব এখনও প্রবল সতর্কতার মুখোমুখি হয়।
এটি কেবল নীতিগত বিতর্ক নয়; এটি ইতিহাস, স্মৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নও। যুদ্ধোত্তর জাপানের শান্তিবাদী মনোভাব এখনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। একই কারণে প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির মতো বিষয়েও জনগণের মধ্যে দ্বিধা রয়ে গেছে।
অতীতের ভার
জাপানের নিরাপত্তা বিতর্কে ইতিহাসের উপস্থিতি এখনও প্রবল। ইয়াসুকুনি মন্দিরকে ঘিরে বিতর্ক তারই উদাহরণ। যুদ্ধাহতদের স্মৃতির পাশাপাশি সেখানে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদেরও স্মরণ করা হয় বলে এটি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর একটি বিষয়।
ফলে জাতীয়তাবাদী প্রতীক ব্যবহার করে রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ানোর কৌশল সবসময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না। জাপানি সমাজের একটি বড় অংশ এখনও ইতিহাসকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে।
ওয়াশিংটনকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অনিশ্চয়তা সম্ভবত জাপান-যুক্তরাষ্ট্র জোটকে ঘিরে। কয়েক দশক ধরে এই জোট জাপানের নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তন, বিশেষ করে আরও লেনদেনভিত্তিক ও স্বার্থকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির উত্থান, জাপানি জনগণের মধ্যে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জনগণের বড় অংশ নিশ্চিত নয় যে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কতটা নির্ভর করা উচিত। এটি জোটের প্রতি অবিশ্বাস নয়; বরং পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় জোটের প্রকৃতি নিয়ে গভীর চিন্তার প্রতিফলন।
তাইওয়ান প্রশ্নে বিভক্ত সমাজ
তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাতের বিষয়টিও জাপানে স্পষ্ট ঐকমত্য তৈরি করতে পারেনি। চীনের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে জাপানের ভূমিকা কী হওয়া উচিত—এ প্রশ্নে জনমত প্রায় সমানভাবে বিভক্ত।
এটি দেখায় যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যতটা দৃঢ় অবস্থান নিতে চাইছে, জনগণ ততটা দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
নিরাপত্তা নীতির ভবিষ্যৎ
জাপানের বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে। সরকার হয়তো দ্রুত কৌশলগত পরিবর্তনের পথে এগোতে চায়, কিন্তু সমাজ এখনও সেই পরিবর্তনের সব দিক নিয়ে নিশ্চিত নয়।
নির্বাচনী বিজয় সরকারকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। জাপানের জনগণ নিরাপত্তা প্রশ্নকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তবে তারা একই সঙ্গে ইতিহাস, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং জাতীয় পরিচয়ের মতো বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে চায়।
এই কারণে আগামী বছরগুলোতে জাপানের নিরাপত্তা বিতর্কের মূল বৈশিষ্ট্য সম্ভবত হবে সমর্থন নয়, বরং দ্বিধা। আর সেই দ্বিধার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে দেশটির নতুন কৌশলগত পথচলা।
পিটার চাই 


















