ডেঙ্গুকে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখা হলেও চলতি বছরের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এখন রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রামীণ এলাকায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের প্রায় ৭৮ শতাংশই ঢাকার বাইরের বাসিন্দা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে বরিশাল বিভাগে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ঢাকার বাইরেই অধিকাংশ রোগী
গত মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে মোট ৫ হাজার ৩১৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৪ হাজার ১২৫ জন রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। রাজধানীতে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৩০ জন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু এখন আর কেবল নগরকেন্দ্রিক রোগ নয়। এটি ধীরে ধীরে জেলা ও গ্রামীণ এলাকাতেও বিস্তার লাভ করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে আরও শক্তিশালী প্রস্তুতি প্রয়োজন।
বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ সংক্রমণ
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৪৪০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
বিশেষ করে পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলায় সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালীতে ২৫৪ জন, পিরোজপুরে ৩৫০ জন এবং ঝালকাঠিতে ২৭১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও চলছে।
জুনে বেড়েছে আক্রান্ত ও মৃত্যু
চলতি বছরের মধ্যে জুন মাসেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ১২০ জন, যেখানে মে মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭১৪ জন। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জুন মাসেই মারা গেছেন সাতজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১৫৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১১৯ জন। এ পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৯১৯ জন সুস্থ হয়েছেন।
কেন বাড়ছে ডেঙ্গুর বিস্তার
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৩ সালের ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রভাব এখনও বিদ্যমান। সে সময় ঈদুল আজহার ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ায় সংক্রমণ বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণকাজে জমে থাকা পানি, বিভিন্ন কৃত্রিম পাত্র এবং বৃষ্টির পানির কারণে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বড় শহরের বাইরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মশা নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা এখনও সীমিত। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত নজরদারি, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
গুলশানে অভিযান, জরিমানা
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে উচ্চপর্যায়ের বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের পর রাজধানীতে অভিযান শুরু হয়েছে। বুধবার গুলশান-২ এলাকায় পরিচালিত এক অভিযানে একটি রেস্তোরাঁর পরিত্যক্ত পাত্রে বিপুল পরিমাণ এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে নির্মাণাধীন ভবন, রেস্তোরাঁ, আবাসিক ভবনের ছাদ ও বেজমেন্ট পরিদর্শন করা হয়। জনসচেতনতা বাড়াতে লিফলেটও বিতরণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ব্যবহৃত মশা নিধন ওষুধের কার্যকারিতা ৯৭ থেকে ১০০ শতাংশ বলে জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















