ঝলমলে ফ্যাশন জগতকে আমরা সাধারণত বাহ্যিক চাকচিক্যের চোখে দেখি। কিন্তু সেই আলো-আড়ালের পেছনে থাকা মানুষের উদ্বেগ, সংগ্রাম ও ব্যক্তিগত সংকটের গল্পই তুলে ধরেছে নতুন চলচ্চিত্র ‘ক্যুচার’। ছবিটি ফ্যাশনের চাকচিক্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে সেই মানুষদের, যাদের পরিশ্রমে এই স্বপ্নের জগৎ বাস্তব হয়ে ওঠে।
কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছেন ম্যাক্সিন ওয়াকার, যার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। তিনি স্বল্প বাজেটের ভৌতিক চলচ্চিত্র নির্মাতা। এক খ্যাতিমান ফ্যাশন ডিজাইনার তাকে প্যারিসে আমন্ত্রণ জানান একটি বিশেষ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য, যা একটি বড় ফ্যাশন শোর সূচনায় প্রদর্শিত হবে।
তবে প্যারিসে পৌঁছানোর পর ম্যাক্সিনের জীবন হঠাৎই অন্য মোড় নেয়। চিকিৎসকের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তার স্তন ক্যানসার ধরা পড়েছে। একই সময়ে তার ব্যক্তিগত জীবনও অস্থিরতায় ভরা। ভেঙে যাচ্ছে দাম্পত্য সম্পর্ক, দূরে সরে যাচ্ছে কিশোরী মেয়ে। তবুও সবকিছু সামলে কাজ শেষ করার চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি।
ছবির অন্যতম শক্তি অ্যাঞ্জেলিনা জোলির অভিনয়। চরিত্রটির প্রথম ধাক্কা, অস্বীকারের মনোভাব এবং পরে দ্রুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার মানসিকতা তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেছেন। তবে ছবির আকর্ষণ শুধু প্রধান চরিত্রে সীমাবদ্ধ নয়।

বহিরাগত এক তরুণীর চোখে ফ্যাশন দুনিয়া
গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আডা। দক্ষিণ সুদান থেকে প্যারিসে আসা এই তরুণী মডেল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছে। তাকে শুধু চলচ্চিত্রেই নয়, বড় ফ্যাশন শোর উদ্বোধনী মডেল হিসেবেও বেছে নেওয়া হয়। কিন্তু নিজের ভেতরে সে এখনো একজন মডেল হিসেবে আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায়নি।
ফ্যাশনের কঠিন ও কখনো কখনো নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে আডা দর্শকদের জন্য এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। তার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দর্শক এই বন্ধ ও অপরিচিত জগতের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পায়।
মেকআপ শিল্পীর অসমাপ্ত স্বপ্ন
ছবির সবচেয়ে আবেগঘন অংশগুলোর একটি জড়িয়ে আছে মেকআপ শিল্পী অ্যাঞ্জেলের সঙ্গে। তিনি তার পেশাগত জীবনে এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করেন এবং লেখক হওয়ার স্বপ্ন লালন করেন। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা তিনি একটি খাতায় লিখে রাখেন, যা একদিন বই হিসেবে প্রকাশ করতে চান।
কিন্তু তার স্বপ্নকে গুরুত্ব দেয় না সবাই। লেখালেখির পরামর্শদাতার সঙ্গে এক কথোপকথনে তিনি শুনতে পান, তার অভিজ্ঞতাগুলো বাস্তব হলেও নাকি যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়। এই মুহূর্তটি শুধু অ্যাঞ্জেলের হতাশাই নয়, সৃজনশীল মানুষের সংগ্রামকেও সামনে নিয়ে আসে।
ছোট ছোট মুহূর্তের বড় শক্তি
‘ক্যুচার’-এর বিশেষত্ব বড় কোনো নাটকীয় ঘটনায় নয়, বরং অসংখ্য ছোট ছোট পর্যবেক্ষণে। মডেলদের পায়ে ফোসকা পড়ে যাওয়ার দৃশ্য, সেই ক্ষত ঢাকতে মেকআপের ব্যবহার কিংবা একে অন্যের প্রতি নীরব সহানুভূতির মুহূর্ত—সব মিলিয়ে ছবিটি মানবিক অনুভূতির সূক্ষ্ম স্তরগুলোকে স্পর্শ করেছে।
ফ্যাশনের ঝলকানি এখানে কেবল পটভূমি। মূল গল্প মানুষের, তাদের স্বপ্ন, ভয়, ব্যর্থতা এবং এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রামের। আর সেই কারণেই ‘ক্যুচার’ শুধু একটি ফ্যাশনভিত্তিক চলচ্চিত্র নয়, বরং জীবনের ছোট ছোট সত্যকে ধারণ করা এক মানবিক গল্প হয়ে উঠেছে।
ফ্যাশনের আড়ালের বাস্তবতা, ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই এবং স্বপ্নের সংগ্রাম নিয়ে আলোচনায় অ্যাঞ্জেলিনা জোলির নতুন ছবি ‘ক্যুচার’।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















