আর্কটিক অঞ্চলকে ঘিরে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলতে শুরু করায় নতুন নৌপথ, বিপুল খনিজ সম্পদ এবং কৌশলগত সামরিক গুরুত্বের কারণে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর নজর এখন এই অঞ্চলের দিকে। এমন বাস্তবতায় রাশিয়ার দ্রুত সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মুখে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে নতুন করে পরিকল্পনা করছে উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট নাটো।
সম্প্রতি উত্তর নরওয়ের তুষারাচ্ছন্ন এলাকায় বৃহৎ সামরিক মহড়ায় অংশ নেয় প্রায় ৩০ হাজার সেনা। মহড়ার মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব দিক থেকে আসা সম্ভাব্য শত্রুর বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধের প্রস্তুতি যাচাই করা। বিশ্লেষকদের মতে, এই শত্রু বলতে মূলত রাশিয়াকেই বোঝানো হয়েছে।
আর্কটিকে কেন বাড়ছে গুরুত্ব
বিশ্ব রাজনীতিতে আর্কটিক এখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ। একই সঙ্গে অঞ্চলটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এবং বরফ গলার কারণে নতুন বাণিজ্যিক রুটও উন্মুক্ত হচ্ছে।
গত এক দশকে রাশিয়া আর্কটিকে ব্যাপক সামরিক বিনিয়োগ করেছে। তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বরফভাঙা জাহাজ বহর আধুনিক করেছে, সোভিয়েত আমলের বহু সামরিক ঘাঁটি পুনরায় চালু করেছে এবং সমুদ্র ও আকাশ নজরদারি সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
নাটোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
নাটো কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু সামরিক মহড়া যথেষ্ট নয়। আর্কটিকে কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বরফভাঙা জাহাজ, সাবমেরিন, ড্রোন, উপগ্রহ এবং উন্নত নজরদারি ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্কটিকের কঠোর আবহাওয়ায় সাধারণ সামরিক সরঞ্জাম প্রায়ই অকার্যকর হয়ে পড়ে। শীতকালে অনেক এলাকায় তাপমাত্রা মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। ফলে সেখানে কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
এছাড়া সমুদ্রের নিচে সাবমেরিন শনাক্ত করার প্রযুক্তিও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সমুদ্রের লবণাক্ততা ও স্রোতের পরিবর্তনের ফলে শব্দের গতি বদলে যাচ্ছে, যা সাবমেরিন শনাক্তকরণকে আরও কঠিন করে তুলছে।
রাশিয়ার নজরদারি ও সামরিক সক্ষমতা
নরওয়ে ও ফিনল্যান্ড সীমান্তের কাছে অবস্থিত কোলা উপদ্বীপকে রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশটির পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতার বড় অংশ এখানেই অবস্থান করছে। এখান থেকে রাশিয়া দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিন মোতায়েন করতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে রাশিয়ার গোয়েন্দা জাহাজের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত জলপথগুলোর ওপর মস্কোও নিবিড় নজর রাখছে।
ইউরোপ ও কানাডার নতুন উদ্যোগ
রাশিয়ার অগ্রগতির জবাবে নাটোর ইউরোপীয় সদস্যরা প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পথে হাঁটছে। উত্তর ইউরোপের দেশগুলো আগামী দশকের মধ্যে জাতীয় আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
নরওয়ে নতুন যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন কিনছে। ফিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে নতুন বরফভাঙা জাহাজ নির্মাণ করছে। কানাডাও আর্কটিক অঞ্চলে অবকাঠামো ও নিরাপত্তা জোরদারে কয়েক বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
একই সঙ্গে সুইডেন, ফিনল্যান্ড এবং অন্যান্য উত্তর ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সমন্বয়ও বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উদ্বেগ
নাটোর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটনের নীতিগত পরিবর্তন এবং ইউরোপে সামরিক উপস্থিতি পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা মিত্র দেশগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা আর্কটিক অঞ্চলে জোটের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবুও ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি অনুভব করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের মতো তাৎক্ষণিক সংকটের কারণে আর্কটিক অনেক সময় অগ্রাধিকারের বাইরে চলে যায়। কিন্তু ভবিষ্যতের ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য এই অঞ্চল যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই।
আর্কটিকের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিযোগিতা আগামী বছরগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে। আর সেই বাস্তবতায় নাটোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় শক্তিশালী করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















