ফিলিপাইনের একটি স্কুলে ভয়াবহ গুলিবর্ষণের ঘটনায় তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং ২০ জন আহত হওয়ার পর দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে শিশুদের ফৌজদারি দায় বহনের ন্যূনতম বয়সসীমা। অনেকেই এখন আইন পরিবর্তন করে আরও কম বয়সী শিশুদেরও অপরাধের জন্য বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলছেন।
গত ২২ জুন মধ্য ফিলিপাইনের লেইতে অঞ্চলের টাকলোবান শহরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী সহপাঠীদের ওপর গুলি চালায়। অভিযুক্ত দুই কিশোরের বয়স ১৪ ও ১৫ বছর। ঘটনাস্থলেই তাদের আটক করা হয়।
বর্তমান আইনে ভিন্ন আচরণ
দেশটির বিদ্যমান আইনের কারণে দুই অভিযুক্তের ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ১৫ বছর বয়সী কিশোরের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে ১৪ বছর বয়সী অভিযুক্তকে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত করা যাবে না। তাকে শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হবে।

নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যরা এ ব্যবস্থায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, দুই অভিযুক্তকেই সমানভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। বিশেষ করে নিহতদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, কম বয়সী অভিযুক্তই হামলায় বেশি সক্রিয় ছিল।
দেশজুড়ে আইন পরিবর্তনের দাবি
ঘটনার পর থেকেই ফিলিপাইনে শিশু অপরাধ সংক্রান্ত আইন নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক নেতা ও আইনপ্রণেতা ফৌজদারি দায় বহনের ন্যূনতম বয়স ১৫ থেকে কমিয়ে ১২ বা এমনকি ১০ বছর করার প্রস্তাব দিচ্ছেন।
দেশটির প্রেসিডেন্টও বয়সসীমা কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, শিশুদের ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত করার প্রবণতা বাড়ছে। মাদক চক্রসহ বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠী আইনগত সুবিধা নিতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাজে লাগাচ্ছে।
এদিকে এক সিনেটর ২০২৫ সালে উত্থাপিত একটি বিল দ্রুত আলোচনায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, স্কুলে গুলিবর্ষণের মতো ঘটনা নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে এবং তা মোকাবিলায় আইন হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
সহিংস অনলাইন কনটেন্ট নিয়ে উদ্বেগ

তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্তদের একজন হামলার আগে নিয়মিত সহিংস ভিডিও ও অনলাইন কনটেন্ট দেখত। এ তথ্য সামনে আসার পর শিশুদের সহিংস ভিডিও গেম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবিও জোরালো হয়েছে।
তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, ১৪ বছর বয়সী অভিযুক্ত একটি সহিংস যুদ্ধভিত্তিক ভিডিও গেম খেলত। সরকার আপাতত গেমটির প্রবেশাধিকার বন্ধ করে এর সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে দেখছে।
বিরোধী মতও রয়েছে
তবে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বয়সসীমা কমানোর বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, কেবল আইন কঠোর করলেই শিশুদের সহিংসতা কমবে না। বরং পারিবারিক ভাঙন, দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, স্কুলে বুলিং, সহপাঠীদের চাপ এবং সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলা সামাজিক পরিবেশের মতো কারণগুলো মোকাবিলা করতে হবে।

তারা বলছেন, বর্তমান আইনেও শিশু অপরাধীদের পুনর্বাসন ও তত্ত্বাবধানে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই সমস্যার মূল কারণ দূর করাই বেশি জরুরি।
তদন্ত চলবে বিভিন্ন পর্যায়ে
মর্মান্তিক এ ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ফিলিপাইনের সিনেট এবং মানবাধিকার কমিশনও পৃথক তদন্ত শুরু করার প্রস্তুতি নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিহতদের প্রতি সম্মান জানানো, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ফিলিপাইনের এই স্কুল হামলা শুধু একটি অপরাধের ঘটনা নয়, বরং শিশু, পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা ও আইনের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে জাতীয় আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















