পশ্চিম ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এবারের তীব্র তাপপ্রবাহ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি ছাড়া এমন মাত্রার তাপপ্রবাহ প্রায় অসম্ভব ছিল। বিশেষ করে রাতের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা মাত্র দুই দশক আগের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছে।
জলবায়ুবিষয়ক গবেষকদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পর্যবেক্ষণ করা অঞ্চলে এটি এখন পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চ তাপমাত্রা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সীমিত করেছে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক স্থাপনাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড
ব্রিটেনে জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ইউরোপের তাপপ্রবাহ আগের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭৬ সালের জুন মাসে একই ধরনের আবহাওয়া পরিস্থিতি ঘটলেও তাপমাত্রা বর্তমান সময়ের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকত।

ইউরোপের ৮০০টিরও বেশি শহর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় ৪৫ শতাংশ শহরে জুনের শেষ সপ্তাহে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপজনিত চাপ রেকর্ড হয়েছে বা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাপজনিত চাপ এমন একটি অবস্থা, যখন শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে যথেষ্ট ঠান্ডা রাখতে ব্যর্থ হয়।
রাতের গরমে বাড়ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি হলো অস্বাভাবিক উষ্ণ রাত। দিনের প্রচণ্ড গরমের পর শরীর স্বাভাবিকভাবে বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায় না। ফলে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং অসুস্থ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
ফ্রান্সের কিছু এলাকায় টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাতের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি। কোনো কোনো রাতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই ধরনের উষ্ণ রাতকে আবহাওয়াবিদরা ‘ক্রান্তীয় রাত’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
কেন বাড়ছে তাপপ্রবাহ

বিজ্ঞানীদের মতে, কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়েছে। এর প্রভাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তাপপ্রবাহ এখন শুধু বেশি ঘন ঘন নয়, আগের চেয়েও অনেক বেশি তীব্র আকারে দেখা দিচ্ছে।
গবেষকদের সতর্কবার্তা হলো, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির গতি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে নতুন নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড আরও দ্রুত ভাঙতে থাকবে। ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত প্রভাব এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান না হলেও বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে উষ্ণ রাতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে জনস্বাস্থ্যের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, চলমান তাপপ্রবাহের পেছনে প্রশান্ত মহাসাগরীয় আবহাওয়ার বিশেষ প্রভাবকগুলোর ভূমিকা খুবই সীমিত। বরং দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নই বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















