পূর্ব এশিয়ার অনেক উন্নত অর্থনীতি এখন বিশ্বের সবচেয়ে কম জন্মহারের দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে। হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, চীন, ম্যাকাও ও সিঙ্গাপুরে ক্রমেই বাড়ছে এক সন্তানেই পরিবার সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা। এর ফলে শুধু জনসংখ্যা নয়, অর্থনীতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জন্মহার নতুন সংকটে
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হংকংয়ে ২০২৫ সালে মোট জন্মহার নেমে এসেছে ০.৭৩-এ। তাইওয়ানে এই হার আরও কম, মাত্র ০.৬৯। দক্ষিণ কোরিয়ায় কিছুটা উন্নতি হলেও জন্মহার ০.৮-এর বেশি নয়, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় ২.১-এর তুলনায় অনেক কম।
ম্যাকাওয়ে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে জন্মহার মাত্র ০.৪৭, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে শহরটিতে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ৮৭১, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

কেন সন্তান নিতে অনাগ্রহ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্তান লালন-পালনের ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়াই অন্যতম বড় কারণ। বাসস্থান, শিশুর যত্ন, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের চাপ অনেক দম্পতিকে দ্বিতীয় সন্তান তো দূরের কথা, প্রথম সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও ভাবতে বাধ্য করছে।
অনেক পরিবারের ধারণা, যদি একটি সন্তানই থাকে, তাহলে তার জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব। ফলে সন্তান সংখ্যা কমলেও প্রতিটি শিশুর পেছনে ব্যয় বাড়ছে।
এক সন্তানের জন্য সবকিছু
তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকংয়ের বহু পরিবার সন্তানের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে অতিরিক্ত কোচিং, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং নানা ধরনের প্রশিক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। অভিভাবকদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে, কারণ তারা চান তাদের সন্তান অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকুক।
এ কারণে অনেক পরিবার জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তনও আনছে। কেউ শহরের কেন্দ্র ছেড়ে দূরের এলাকায় বসবাস শুরু করছে, আবার কেউ ব্যক্তিগত চাহিদা কমিয়ে সন্তানের পেছনে বেশি অর্থ ব্যয় করছে।
সমাজ ও অর্থনীতির জন্য সতর্ক সংকেত
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, কম জন্মহার শুধু পারিবারিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। বর্তমান সময়ে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ায় অনেক মানুষ সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন।
বিশেষ করে নারীদের জন্য ক্যারিয়ার ও মাতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা কমে যাচ্ছে।
কম শিশুর জন্ম এবং মানুষের দীর্ঘায়ুর কারণে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যার দিকে এগোচ্ছে। এতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সংকুচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা, কর রাজস্ব, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সমাধানের পথ খুঁজছে সরকার
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন সরকার সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে আর্থিক সহায়তা, কর সুবিধা এবং পরিবারবান্ধব নীতি গ্রহণ করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রণোদনা দিলেই হবে না। মানুষের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা, কর্মপরিবেশ, আবাসন সংকট এবং সামাজিক প্রত্যাশার মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানও জরুরি।
তাদের মতে, অর্থপূর্ণ কাজ, স্থিতিশীল সম্পর্ক এবং স্বস্তিদায়ক জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে জন্মহার সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















