বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও পাপেট শিল্পের অগ্রদূত মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
পরিবারের সদস্যদের জানানো তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
সংস্কৃতি অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। শোকবার্তায় তিনি বলেন, বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলো এবং দেশের কিংবদন্তি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ দেশের গণমাধ্যম ও সৃজনশীল সংস্কৃতির বিকাশে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
‘বাংলাদেশের পাপেট ম্যান’ হিসেবে পরিচিতি
মুস্তাফা মনোয়ারকে ‘বাংলাদেশের পাপেট ম্যান’ নামে সারা দেশে পরিচিতি এনে দিয়েছিল তাঁর অসাধারণ পাপেট শিল্প। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী শিবিরগুলোতে পাপেট শো আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর জনপ্রিয় পাপেট অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ টানা ১২ বছর সম্প্রচারিত হয়। লোককাহিনি ‘সাত ভাই চম্পা’ অবলম্বনে নির্মিত এই অনুষ্ঠানটি পারুল ও তার সাত ভাইয়ের গল্পের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁর সৃজনশীল কাজ দেশের একাধিক প্রজন্মের শৈশবকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি ছিলেন খ্যাতিমান কবি গোলাম মোস্তফার কনিষ্ঠ সন্তান। নারায়ণগঞ্জ সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও পরে সরকারি আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট কলেজে চারুকলায় অধ্যয়ন করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
পেশাজীবনে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং জাতীয় গণযোগাযোগ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (এফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ডিরেক্টরস গিল্ড বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দেশ-বিদেশে তাঁর শিল্পসাধনার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অল ইন্ডিয়া ফাইন আর্টস প্রতিযোগিতার পুরস্কার, জয়নুল আবেদিন স্বর্ণপদক এবং ২০০৪ সালে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক লাভ করেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণে বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম অঙ্গন হারাল এক নিবেদিতপ্রাণ স্রষ্টাকে। তাঁর কর্ম, শিল্পচর্চা ও সৃজনশীল উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের কাছেও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















