ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলার চরাঞ্চলের অন্তত ১৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নদীর পানি আপাতত বিপৎসীমার নিচে থাকলেও যেকোনো সময় আবারও তা বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে সতর্ক করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পানিবন্দি হাজারো পরিবার
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের ৪০টি গেট খুলে দেওয়ার পর রোববার বিকেল থেকে তিস্তার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। রাত ১১টা পর্যন্ত নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হয়।
পানির অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেটও খুলে দেওয়া হয়। এতে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয় এবং রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার চরাঞ্চলের অন্তত ১৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
নদীভাঙনে ক্ষতি, ভেসে গেছে ঘরবাড়ি
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, পানির উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙনও বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ জেলায় অন্তত ২৬টি বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
পানিবন্দি কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, দুই দিন ধরে দুর্ভোগে থাকলেও এখনো কেউ তাদের খোঁজ নিতে বা সহায়তা দিতে এগিয়ে আসেনি।
আবারও পানি বাড়ার আশঙ্কা
সোমবার (২৯ জুন) দুপুর ১২টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচে, অর্থাৎ ৫২ দশমিক ০ সেন্টিমিটার উচ্চতায় রেকর্ড করা হয়। তবে পাউবো জানিয়েছে, অব্যাহত বৃষ্টি ও উজানের পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকলে নদীর পানি আবারও দ্রুত বাড়তে পারে।
তিস্তা তীরবর্তী বাসিন্দারাও নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ফসল তলিয়ে কৃষকের দুশ্চিন্তা
বন্যার পানিতে হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। চিনাবাদাম, আমন ধানের বীজতলা এবং মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
কালীগঞ্জের কাশীরাম এলাকার কৃষক লোকমান মিয়া জানান, ইজারা নেওয়া ৭০ শতক চরজমিতে তিনি চিনাবাদামের আবাদ করেছিলেন। দীর্ঘ সময় জমিতে পানি জমে থাকায় গাছ পচতে শুরু করেছে এবং হলুদ হয়ে যাচ্ছে। এতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রংপুরের চর ছাব্বিশ হাজারী গ্রামের কৃষক নজরুল হক বলেন, রোববার রাত থেকে টানা বৃষ্টি এবং উজানের পানির কারণে নদীর পানি বাড়ছে। এতে আমনের বীজতলা, চিনাবাদাম, মিষ্টিকুমড়াসহ অন্যান্য ফসল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
মহিপুর চর এলাকার কৃষক বুলু মিয়া জানান, উজানের ঢলে ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে পরিবার ও গবাদিপশু নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তারা।
সহায়তার প্রস্তুতি
রংপুর বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, তিস্তার চরাঞ্চলের যেসব পরিবার এখনো পানিবন্দি রয়েছে, তাদের তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকা পাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হবে।
ডালিয়া পয়েন্টের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, তিস্তার পানি কখনো বিপৎসীমার ওপরে আবার কখনো নিচে ওঠানামা করছে। তিনি চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বৃষ্টি ও উজানের পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকলে দিনের পরবর্তী সময়ে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।
তিস্তার পানি বৃদ্ধি: উত্তরের পাঁচ জেলায় ১৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি, ফসল ও বসতবাড়িতে নতুন শঙ্কা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















