স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া, যেখানে ওষুধের অপব্যবহার রোধ করা যাবে, আবার প্রকৃত রোগীর চিকিৎসাও ব্যাহত হবে না। কিন্তু যখন সম্ভাব্য ঝুঁকির আশঙ্কা বাস্তব চিকিৎসাগত প্রয়োজনের ওপর প্রাধান্য পায়, তখন সেই ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। ইন্দোনেশিয়ায় চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত ওপিওয়েডের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বহু ওপিওয়েড ওষুধকে অপরিহার্য চিকিৎসাসামগ্রী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও ইন্দোনেশিয়ায় এগুলোর ব্যবহার অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম। পরিসংখ্যানটি কেবল একটি সংখ্যাগত বৈষম্য নয়; এটি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যেখানে গুরুতর ব্যথায় আক্রান্ত বহু রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই সংকটের কারণ রোগীর অভাব নয়, বরং নীতিগত সীমাবদ্ধতা। দীর্ঘদিন ধরে মাদক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কঠোর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রভাব ফেলেছে। ফলে চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওপিওয়েডকে অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয়, যেন এগুলোর প্রধান পরিচয় একটি সম্ভাব্য অপরাধের উৎস; অথচ বাস্তবে এগুলো ক্যানসার, বড় অস্ত্রোপচার কিংবা উপশমমূলক চিকিৎসায় তীব্র ব্যথা নিয়ন্ত্রণের অপরিহার্য ওষুধ।
অবশ্যই ওপিওয়েড সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। আসক্তি, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অপব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক নীতি হলো ঝুঁকি ও উপকারের তুলনামূলক মূল্যায়ন। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সঠিক রোগীর জন্য সঠিক মাত্রায় ব্যবহৃত ওপিওয়েডের সুফল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভাব্য ঝুঁকিকে ছাড়িয়ে যায়। তাই এগুলোকে কেবল ভয়ের দৃষ্টিতে দেখা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
সমস্যার আরেকটি দিক সরবরাহব্যবস্থায়। সরকারের আমদানি নীতিতে সতর্কতা এতটাই প্রবল যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ওষুধই দেশে আসে না। অথচ পরবর্তী পর্যায়ে এই কম ব্যবহারকেই আবার কম আমদানির যৌক্তিকতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। এতে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়—সরবরাহ কম থাকায় ব্যবহার কম, আর ব্যবহার কম হওয়ায় সরবরাহও বাড়ানো হয় না।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে হাসপাতাল ও রোগীদের ওপর। অনেক হাসপাতালে ওপিওয়েডের মজুত সীমিত থাকে, সংগ্রহ প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়, কখনো অর্থ পরিশোধের শর্তও চিকিৎসাসেবাকে জটিল করে তোলে। অনেক ফার্মেসি অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতা ও কম আর্থিক লাভের কারণে এই ওষুধ সংরক্ষণে আগ্রহ দেখায় না। ফলে চিকিৎসকরা অনেক সময় জানেন যে নির্দিষ্ট রোগীর জন্য ওপিওয়েডই সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প, তবু ওষুধটি রোগী আদৌ পাবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তা তাদের অন্য চিকিৎসাপদ্ধতি বেছে নিতে বাধ্য করে।
এই পরিস্থিতি নীতিনির্ধারণের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে। কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এবং নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এক নয়। অবৈধ মাদক পাচার ও বাণিজ্য দমন অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে গিয়ে বৈধ চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হলে প্রকৃত ক্ষতির শিকার হন রোগীরাই।
অনেকের আশঙ্কা উত্তর আমেরিকার ওপিওয়েড সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকে যান্ত্রিকভাবে অন্য দেশের বাস্তবতায় প্রয়োগ করা যুক্তিযুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে সংকটের পেছনে ছিল আক্রমণাত্মক বিপণন, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের অনিয়ন্ত্রিত প্রসার। ইন্দোনেশিয়ার বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে আমদানি, বিতরণ এবং ব্যবস্থাপনা রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এবং ওপিওয়েড দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা ব্যবস্থাপনায় নিয়মিতভাবে ব্যবহৃতও হয় না।
গবেষণায়ও চিকিৎসকদের দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রেসক্রিপশনের প্রমাণ মেলেনি। বরং চিকিৎসাকর্মীরা বিদ্যমান নিয়ম সম্পর্কে সচেতন এবং কঠোর নজরদারির পক্ষেই মত দিয়েছেন। তারা প্রশাসনিক জটিলতা, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরলেও বৈধ সরবরাহ বাড়লেই অপব্যবহার বেড়ে যাবে—এমন ধারণার পক্ষে কোনো বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এখানেই নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়। যখন অনুমানভিত্তিক ঝুঁকি বাস্তব তথ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, তখন জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাস্থ্যনীতি যদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ক্লিনিক্যাল বাস্তবতা এবং রোগীর অধিকারের পরিবর্তে আশঙ্কা ও রাজনৈতিক মনোভাব দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে অপরিহার্য চিকিৎসাও নাগরিকের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
অবশ্যই ওপিওয়েডের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। নিরাপদ সংরক্ষণ, সঠিক হিসাব, প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন এবং কার্যকর নজরদারি—এসব কোনোভাবেই শিথিল করার প্রশ্ন নেই। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা, চিকিৎসার সুযোগ সংকুচিত করা নয়।
একটি মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সবচেয়ে দুর্বল ও সবচেয়ে কষ্টে থাকা মানুষের প্রতি তার আচরণে। অসহনীয় ব্যথায় আক্রান্ত রোগী যদি অনুমাননির্ভর ভয়ের কারণে প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বঞ্চিত হন, তবে সেটি শুধু একটি নীতিগত ব্যর্থতা নয়, স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক ন্যায়বিচারেরও পরাজয়। জনস্বাস্থ্য ও আইন প্রয়োগ—দুটি লক্ষ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু একটিকে রক্ষা করতে গিয়ে অন্যটিকে অকার্যকর করে তোলা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।
লেখক: এলিজাবেথ ক্র্যামার, সিনিয়র লেকচারার (রাজনীতি ও জননীতি), ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস (UNSW)। এই নিবন্ধটি তাঁর মূল মতামতধর্মী লেখার ভিত্তিতে নতুন ভাষা ও বিন্যাসে রচিত।
এলিজাবেথ ক্র্যামার 


















