ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত ব্যাহত হওয়ার ফলে বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। জ্বালানি, সার ও রাসায়নিক পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে একই সংকটের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে উঠে এসেছে চীন। নতুন এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জ্বালানি মজুত, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সক্ষমতা এবং সরকারি নীতিগত সহায়তার কারণে সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এড়াতে পেরেছে দেশটি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য এশিয়া গ্রুপের প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা এশিয়ার অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেললেও চীন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এতে বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে দেশটির প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
সংকট সামাল দেওয়ার পেছনে কী কাজ করেছে
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও গ্যাসের কৌশলগত মজুত, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিস্তৃত ব্যবহার এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি ও নিয়ন্ত্রিত মুদ্রানীতির মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে চীন অর্থনীতির ওপর ধাক্কা অনেকটাই শোষণ করতে পেরেছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে চীন নিজেকে অনেক দেশের কাছে তুলনামূলক স্থিতিশীল অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। এর পাশাপাশি সৌর প্যানেল, ব্যাটারি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির বৈশ্বিক চাহিদাও বেড়েছে, যেখানে চীনের আধিপত্য রয়েছে।
এশিয়াজুড়ে জ্বালানি ও কাঁচামালের চাপ
বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন অঞ্চল এশিয়ার প্রায় ৮০ শতাংশ তেল এবং ৯০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে অস্থিরতা পুরো অঞ্চলের শিল্প খাতকে প্রভাবিত করেছে।
শুধু জ্বালানিই নয়, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক শিল্পে ব্যবহৃত ন্যাফথা, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে ব্যবহৃত হিলিয়াম এবং তামা ও নিকেল পরিশোধনে প্রয়োজনীয় সালফারের সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। এতে বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

ভারত, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে সার, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টির আশঙ্কার সঙ্গে সার সংকট যুক্ত হওয়ায় কৃষি খাত আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
জাপানে জ্বালানির উচ্চমূল্য সরকারের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে অ্যালুমিনিয়াম ও ন্যাফথার ঘাটতির কারণে গাড়ি শিল্পে উৎপাদন কমানো এবং সরবরাহে বিলম্বের ঘটনা ঘটছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ, যারা জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তারা অর্থনীতি সচল রাখতে জরুরি ঋণ ও ভর্তুকির আশ্রয় নিয়েছে। ফিলিপাইনে শ্রমিক অসন্তোষ ও জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় সালফিউরিক অ্যাসিডের ঘাটতিতে নিকেল উৎপাদন কমেছে এবং বিমান ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বালির পর্যটনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চীনের রপ্তানিতে নতুন গতি
জ্বালানি সংকটের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো সৌর প্যানেল, ব্যাটারি শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য ক্রমেই চীনের দিকে ঝুঁকছে। ফলে এসব খাতে চীনের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রবণতাকেও ধীর করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম চীনের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছিল, বর্তমান সংকট সেই প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
সংকট কতদিন স্থায়ী হবে?
যদিও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে যে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি সমঝোতা হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কিছুটা বেড়েছে, তবু সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হুমকির কারণে পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধ থেমে গেলেও জাহাজের বীমা ব্যয়, বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যয় বৃদ্ধির মতো প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনুভূত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট দীর্ঘায়িত হলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বহু দেশের কৌশলগত জ্বালানি মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক উৎপাদন ও বাণিজ্যের ওপর আরও গভীর প্রভাব ফেলবে।
হরমুজ প্রণালি সংকটের মধ্যে চীনের অর্থনৈতিক সুবিধা বাড়লেও এশিয়ার অধিকাংশ দেশের জন্য এটি এখনও একটি বড় অর্থনৈতিক ও শিল্পগত চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















