যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশেষ ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী ‘ফ্রিডম ট্রাক’। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনে পরিচালিত এই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন ইতিহাসকে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আদর্শের আলোকে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এতে দাসপ্রথা, আদিবাসীদের ভূমি দখল এবং বর্ণবৈষম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোকে অনেকটাই আড়াল করা হয়েছে।
দেশজুড়ে চলমান প্রদর্শনী
বিশেষভাবে সাজানো ছয়টি ট্রাকের প্রতিটিতে রয়েছে দুটি কক্ষের প্রদর্শনী। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণা, বিপ্লবী যুদ্ধ এবং প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত ২৮টি অঙ্গরাজ্যে ৮০টির বেশি স্থানে প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ প্রায় সব অঙ্গরাজ্যেই অন্তত একটি প্রদর্শনীর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় উদ্যান, কমিউনিটি অনুষ্ঠান, রাজ্য মেলা এবং বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে এসব ট্রাক নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
স্বাধীনতার আদর্শকে কেন্দ্র করে বার্তা
প্রদর্শনীর মূল বার্তা হলো—‘সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে’—যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের এই নীতিই দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রদর্শনীর অন্যতম রচয়িতা ম্যাথিউ স্পল্ডিংয়ের মতে, এই নীতিই পরবর্তীতে দাসপ্রথা বিলোপের আন্দোলন এবং কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশটি শেষ পর্যন্ত দাসপ্রথাকে অতিক্রম করেছে। সেই ইতিবাচক যাত্রাকেই প্রদর্শনীতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কী রয়েছে প্রদর্শনীতে
প্রদর্শনীতে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভিন্ন যুদ্ধ, থমাস পেইনের ‘কমন সেন্স’, বিভিন্ন ‘আমেরিকান নায়ক’, নাগরিক শিক্ষা বিষয়ক ইন্টারঅ্যাকটিভ কুইজ এবং দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলনের নেতা ফ্রেডেরিক ডগলাসের বক্তব্যের অংশ তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া দাসপ্রথার শিকার হয়েও সাফল্য অর্জনকারী কিছু ব্যক্তির গল্পও স্থান পেয়েছে।
সমালোচনার কেন্দ্রে যা
ইতিহাসবিদ ও শিক্ষাবিদদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রদর্শনীতে নারীদের ভোটাধিকারের দীর্ঘ আন্দোলন, আদিবাসীদের ভূমি ও জীবন হারানোর ইতিহাস কিংবা দাসপ্রথার নির্মম বাস্তবতা প্রায় অনুপস্থিত।
তাদের মতে, লক্ষ লক্ষ দাস মানুষের ওপর চালানো নির্যাতন, পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং দাসপ্রথার ব্যাপক বিস্তারের মতো বিষয়গুলো দর্শনার্থীরা জানতে পারেন না।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের মধ্যে জর্জ ওয়াশিংটন, থমাস জেফারসন ও জেমস ম্যাডিসনের দাসমালিক হওয়ার বিষয়টিও প্রদর্শনীতে উল্লেখ করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের ভিন্ন মত
ফিলাডেলফিয়ার ন্যাশনাল কনস্টিটিউশন সেন্টারের কর্মকর্তা জুলি সিলভারব্রুকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে গর্ব ও সত্যনিষ্ঠার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি শক্তিশালী ইতিহাসচর্চায় যেমন সাফল্য থাকবে, তেমনি ব্যর্থতার কথাও থাকবে।
অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের ইতিহাসবিদ জেরাল্ড হর্নের মতে, এই প্রদর্শনী যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে অনেকটাই “পরিষ্কার ও সুগন্ধি” করে উপস্থাপন করেছে এবং বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিয়েছে।
আবার রক্ষণশীল শিক্ষাবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বর্ণবাদ ও বৈষম্যের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতার বিপরীতে এই প্রদর্শনী একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে এসেছে।
দর্শনার্থীদের প্রতিক্রিয়া
কেন্টাকির বাসিন্দা রন্ডা ক্যাম্পবেল প্রদর্শনী দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ভুল ছিল ঠিকই, কিন্তু ইতিবাচক দিকই বেশি। তাঁর মতে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সম্পর্কে অনেক মানুষের যথেষ্ট ধারণা নেই।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন ডিসির বাসিন্দা এরিকা বার্গের অভিযোগ, প্রদর্শনীতে ইতিহাসকে অতিরিক্তভাবে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে দাসপ্রথা ও আদিবাসীদের স্বাধীনতা হরণের প্রসঙ্গ যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।
ইতিহাস শিক্ষার বৃহত্তর প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাসের সব দিক তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে এমন উদ্যোগ দর্শকদের ইতিহাস সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার আগ্রহ তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাস শিক্ষা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই ‘ফ্রিডম ট্রাক’ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—একটি দেশের ইতিহাস কি শুধু তার অর্জনের গল্প বলবে, নাকি সেই অর্জনের পাশাপাশি ব্যর্থতা ও বৈপরীত্যও সমানভাবে তুলে ধরা উচিত?
ট্রাম্প-সমর্থিত ‘ফ্রিডম ট্রাক’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক। ইতিহাসের ইতিবাচক দিক তুলে ধরলেও দাসপ্রথা ও আদিবাসীদের প্রসঙ্গ উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















