২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে আগের যেকোনো আসরের তুলনায় বেশি দল পাঠিয়েও প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি এশিয়া। ৪৮ দলের সম্প্রসারিত এই বিশ্বকাপে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) থেকে অংশ নেয় রেকর্ড নয়টি দল। কিন্তু তাদের মধ্যে সাতটিই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয়। শেষ পর্যন্ত শুধু জাপান ও অস্ট্রেলিয়া নকআউট পর্বে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। বিপরীতে আফ্রিকার ১০ দলের মধ্যে নয়টিই গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে পরের ধাপে উঠে নিজেদের শক্ত অবস্থানের প্রমাণ দিয়েছে।
জাপানের যাত্রা শেষ হলেও দলটি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে কঠিন লড়াইয়ে ফেলেছিল। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন খেলোয়াড়কে ছাড়াই মাঠে নেমে তারা এগিয়েও গিয়েছিল। তবে যোগ করা সময়ের গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া এখন টুর্নামেন্টে এশিয়ার একমাত্র প্রতিনিধি।
ইউরোপিয়ান লিগে খেলার অভিজ্ঞতার গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, সফল দলগুলোর মধ্যে একটি বড় মিল হলো—তাদের অধিকাংশ খেলোয়াড় ইউরোপের শীর্ষ লিগে নিয়মিত খেলেন। আফ্রিকার দলগুলোর পাশাপাশি জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে।
ইরানে কোচিং করানো এবং বর্তমানে চীনের ক্লাব সাংহাই পোর্টের সঙ্গে কাজ করা কোচ জাহানইয়ার মোহেব্বি বলেন, বিশ্বকাপে ভালো করতে হলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি সপ্তাহে উচ্চমানের প্রতিযোগিতায় খেলা ফুটবলাররা বিশ্বকাপের চাপ ও গতি সামাল দিতে বেশি প্রস্তুত থাকেন।
অন্যদিকে কাতার, সৌদি আরব, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো দলগুলো মূলত নিজ দেশের লিগে খেলা ফুটবলারের ওপর নির্ভর করেছে। ফলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে চাপের মুহূর্তে ছোট ছোট ভুল বড় ব্যবধানে পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় লিগ নয়, দরকার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ও কাতার নিজেদের লিগে বিশ্বখ্যাত বিদেশি খেলোয়াড় আনতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। তবে সেটি স্থানীয় প্রতিভা বিকাশে কতটা কার্যকর হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
মোহেব্বির মতে, সৌদি লিগের প্রতিযোগিতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু শীর্ষ ক্লাবগুলোতে বিদেশি খেলোয়াড়ের আধিপত্য স্থানীয় ফুটবলারদের সুযোগ সীমিত করছে। দীর্ঘমেয়াদে উন্নতির জন্য স্থানীয় খেলোয়াড়দের গড়ে তোলা এবং তাদের ইউরোপে খেলার পথ তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বকাপের মঞ্চ সেই সুযোগও তৈরি করে। ইতোমধ্যে উজবেকিস্তান ও জর্ডানের কয়েকজন ফুটবলারের প্রতি ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর আগ্রহের খবর শোনা যাচ্ছে। জর্ডানের কোচ জামাল সেল্লামিও বলেছেন, বড় ইউরোপীয় লিগে খেলতে পারলেই ফুটবলাররা প্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা অর্জন করতে পারেন।

আফ্রিকার সাফল্যের আরেক সূত্র
আফ্রিকার সাফল্যের পেছনে শুধু স্থানীয় প্রতিভা নয়, প্রবাসী ফুটবলারদের কার্যকর ব্যবহারও বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো ব্রাজিলের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের নিয়েই একাদশ সাজিয়েছিল।
একই পথ অনুসরণ করেছে কেপ ভার্দেও। প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েও ইউরোপে জন্ম নেওয়া ফুটবলারদের নিয়ে গড়া দলটি নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়, যেখানে একই অভিষেক আসরে অংশ নেওয়া জর্ডান ও উজবেকিস্তান তা পারেনি।
প্যারিসভিত্তিক এমলিয়ন বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক সাইমন চ্যাডউইকের মতে, বিদেশে বেড়ে ওঠা যোগ্য ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তি এবং বিভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতির সমন্বয় আফ্রিকার অগ্রগতির অন্যতম কারণ।
এশিয়ার সামনে কোন পথ?
ইন্দোনেশিয়া ইতোমধ্যে নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া যোগ্য দ্বৈত নাগরিক ফুটবলারদের দলে অন্তর্ভুক্ত করে ইতিবাচক ফল পেয়েছে। একই সঙ্গে যুব উন্নয়ন, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বিনিয়োগের সুফলও দেখা যাচ্ছে উজবেকিস্তানের মতো দেশে।
মোহেব্বির মতে, এশিয়ার শীর্ষ দলগুলোর সীমাবদ্ধতা দেখে চীনের মতো দেশগুলোর সামনে নতুন আশার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ বছর এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২৩ চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেওয়ায় ২০০২ সালের পর আবার বিশ্বকাপে ফেরার আশা জোরালো হয়েছে।
চ্যাডউইকের মূল্যায়ন, এশিয়ার ফুটবলে এখনও কাঠামোগত অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে সুপরিকল্পিত কৌশল, ধৈর্য, অবকাঠামোগত সংস্কার এবং প্রতিভা বিকাশে ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে মহাদেশটি ভবিষ্যতে বিশ্ব ফুটবলে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।
এশিয়ার বিশ্বকাপ ব্যর্থতা, আফ্রিকার সাফল্য থেকে শেখার সুযোগ
বিশ্বকাপে রেকর্ডসংখ্যক দল পাঠিয়েও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি এশিয়া। ইউরোপে খেলার অভিজ্ঞতা, স্থানীয় প্রতিভা বিকাশ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















