নির্বাচনের রাজনীতিতে প্রচার, স্লোগান কিংবা কূটনৈতিক সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে তাদের দৈনন্দিন জীবন। মানুষ যখন ভোটকেন্দ্রে যায়, তখন তারা সাধারণত একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর খোঁজে—গত কয়েক বছরে আমার জীবন কি আগের চেয়ে ভালো হয়েছে? আয় বেড়েছে কি? চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে কি? নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা সহজ হয়েছে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক হলে সরকারের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক অর্থনীতির গবেষণায় বহুবার দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন সরকারের ভাগ্য মূলত তিনটি অর্থনৈতিক সূচকের ওপর নির্ভর করে—প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতি। এই তিন ক্ষেত্রে সন্তোষজনক ফল এলে ভোটাররা সরকারকে আরেকটি সুযোগ দিতে আগ্রহী হন। কিন্তু প্রবৃদ্ধি কমে গেলে, বেকারত্ব বাড়লে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে রাজনৈতিক সমর্থন দ্রুত ক্ষয়ে যায়।
পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তত্ত্বেরই প্রতিফলন। চার বছর আগে যে প্রত্যাশা নিয়ে সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, তার তুলনায় আজ সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেনি। বরং মাথাপিছু আয়ের স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের সংকট মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বিশ্ব অর্থনীতি এগিয়ে গেলেও পাকিস্তানের বড় একটি অংশ নিজেদের আগের চেয়ে দুর্বল অবস্থানে দেখতে বাধ্য হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির দ্বৈত সংকট একসঙ্গে আঘাত হেনেছে। অর্থনীতি যখন পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে না এবং একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলাফল হিসেবে বেকারত্ব বাড়ে, দারিদ্র্য গভীর হয় এবং সামাজিক বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
দারিদ্র্যের এই ঊর্ধ্বগতি বিশেষভাবে হতাশাজনক, কারণ দীর্ঘ সময় ধরে পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে দারিদ্র্য কমানোর সাফল্য দেখিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারা উল্টে গেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি তাদের অনুপাতও বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতার সূচক নয়; এটি নীতিনির্ধারণের সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন।
সরকারের কিছু কূটনৈতিক সাফল্য কিংবা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অর্জন অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এসব অর্জন সাধারণ মানুষের বাজারের হিসাব বদলে দেয় না। পরিবার যখন মাসের শেষে ব্যয় মেলাতে পারে না, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সাফল্য রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট হয় না। অর্থনীতির দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত অন্য সব সাফল্যকে ছাপিয়ে যায়।
রপ্তানি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও বাস্তবে প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। অথচ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের উচ্চমূল্য পাকিস্তানের শিল্পখাতকে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে দিচ্ছে। ফলে রপ্তানি বাড়ার পরিবর্তে স্থবির হয়ে পড়ছে। অথচ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমাতে রপ্তানি আয়ের বিকল্প নেই।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকট দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তি ও করপোরেট উভয় পর্যায়েই উচ্চ করহার এবং অনিশ্চিত নীতিগত পরিবেশ নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে ওঠে বিনিয়োগের ওপর, কিন্তু সেই ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়লে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হয় না।
অন্যদিকে রাষ্ট্রের ঋণের বোঝা দ্রুত বেড়েছে। একই সময়ে কর আদায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ সরকার একদিকে জনগণের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করছে, অন্যদিকে আরও বেশি ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু এই অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে জনসেবার মানে দৃশ্যমান উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে জনগণের মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক—অতিরিক্ত কর ও ঋণের সুবিধা তারা কোথায় পাচ্ছে?
সরকারের অন্যতম দাবি হলো, তারা দেশকে খেলাপির ঝুঁকি থেকে রক্ষা করেছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে সংকট এড়িয়ে যাওয়া আর টেকসই সংস্কার বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচিতে প্রবেশের পর জনগণ কাঠামোগত সংস্কারের আশা করেছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হয়ে বরং কৃচ্ছ্রসাধনের বোঝা মূলত সাধারণ মানুষের কাঁধেই চাপানো হয়েছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারকে সবসময় দায়ী করাও যথার্থ নয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানিতে অতিরিক্ত কর এবং ভোগ্যপণ্যের ওপর করের বিস্তার অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করেছে। এর ফলে আয় না বাড়লেও ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি দুই দিক থেকে চাপে পড়েছে—একদিকে করের বোঝা, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়।
যদি গত কয়েক বছরে প্রকৃত আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো এবং শিল্পের জন্য জ্বালানির মূল্য প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে রাখা যেত, তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ভিন্ন হতে পারত। মানুষ অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ভবিষ্যতের ওপর আস্থা গড়ে তোলে।
শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কোনো প্রচারণা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাখা যায় না। অর্থনৈতিক বাস্তবতা যদি মানুষের জীবনমান উন্নত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাজনৈতিক ভাষ্যও বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। কার্যকর সংস্কার, উৎপাদনমুখী প্রবৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার—এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া জনপ্রিয়তা পুনর্গঠন সম্ভব নয়। আর সেই কারণেই অর্থনৈতিক সাফল্য শুধু উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক বৈধতারও সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
মিফতাহ ইসমাইল 


















