পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে রাজনৈতিক সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। আগামী ২৭ জুলাই আইনসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে। শুরুতে বিদ্যুৎ বিল, গমের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন রাজনৈতিক অধিকার, স্বশাসন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিতে রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং আন্দোলনকারীদের নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্দোলনের দাবির বিস্তার
জনঅধিকারভিত্তিক সংগঠন যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি প্রথমে অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে। পরে তারা ৩৮ দফা দাবি উত্থাপন করে, যার অন্যতম ছিল আইনসভায় সংরক্ষিত ১২টি শরণার্থী আসন বাতিল করা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গত বছরের আলোচনায় সরকারের সঙ্গে যে সমঝোতা হয়েছিল, তার অধিকাংশই বাস্তবায়ন করা হয়নি।
চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় তারা দীর্ঘমেয়াদি ধর্মঘট, পরিবহন অবরোধ, দীর্ঘ পদযাত্রা এবং আইনসভার সামনে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেয়।

নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা অভিযান
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার পর প্রশাসন সংগঠনটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগে সীমাবদ্ধতা, ১৪৪ ধারা জারি এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
আন্দোলনকারীদের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে তাদের এক নেতার ওপর হামলা চালানো হয় এবং একজন কর্মী নিহত হন। এরপরও বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো মানুষ রাজধানী মুজাফফরাবাদের দিকে পদযাত্রা অব্যাহত রাখেন।
সরকারের অবস্থান
ফেডারেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংরক্ষিত ১২টি আসন সংবিধানগত সুরক্ষার আওতায় রয়েছে। তাই এগুলো বাতিল করা সম্ভব নয়। এই অবস্থানের কারণে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের বিরোধ আরও গভীর হয়েছে।
অবরোধের মধ্যেও চলমান বিক্ষোভ
নিষেধাজ্ঞার প্রায় এক মাস পরও আন্দোলন থামেনি। বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ী অবস্থান কর্মসূচি চলছে। এসব কর্মসূচিতে নারী, প্রবীণ ও শিশুরাও অংশ নিচ্ছেন, যা আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিক্ষোভকারীরা খাদ্য ও ওষুধের সংকট, নির্বিচার গ্রেপ্তার, পুলিশের অভিযানের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম ও ইন্টারনেট ব্যবহারে বাধার অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, জুনের শুরু থেকে বহু মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত থাকায় এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা
আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই ২৭ জুলাইয়ের আইনসভা নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
আন্দোলনের পক্ষ থেকে আরও সতর্ক করা হয়েছে, অবরোধ ও সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা হতে পারে।
বিদেশেও প্রতিবাদের ঢেউ
এই সংকট শুধু অঞ্চলটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কাশ্মীরি প্রবাসীরাও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন।
লন্ডনসহ একাধিক শহরে পাকিস্তানের কূটনৈতিক মিশনের সামনে বিক্ষোভ হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের কয়েক ডজন সংসদ সদস্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। সর্বশেষ লন্ডনে অনুষ্ঠিত বড় পদযাত্রায় কাশ্মীরিদের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের রাজনৈতিক সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে। সংলাপের একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান সামনে আসেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















