তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় শুরু হতে যাওয়া ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনকে ঘিরে সদস্য দেশগুলোর প্রত্যাশা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক কম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে বাড়তে থাকা মতপার্থক্য, নিরাপত্তা ইস্যুতে ভিন্ন অবস্থান এবং কৌশলগত স্বার্থের সংঘাতের কারণে এবার সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখা।
প্রত্যাশার চেয়ে স্থিতিশীলতায় বেশি গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আটলান্টিকের দুই পাড়ের সম্পর্কের অবনতি ন্যাটোকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নীতি এবং নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইস্যু নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় জোটের ভেতরের চাপ আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সম্মেলনে বড় কোনো নীতিগত অগ্রগতির পরিবর্তে কূটনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তার বোঝা ভাগাভাগি নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে। এবারও সেই বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, ইউরোপকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি নিতে হবে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর বিভিন্ন সামরিক পদক্ষেপে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানকেও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ফলে নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সমর্থনও এখন জোটের সম্পর্ক মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
ইউরোপের জন্য নতুন বাস্তবতা
ইউরোপীয় দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় আরও সতর্ক হতে হবে। কারণ পারস্পরিক আস্থার পরিবর্তে স্বার্থভিত্তিক সমঝোতার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে ন্যাটোর ভেতরে আগের মতো অভিন্ন মূল্যবোধের পরিবর্তে বাস্তব রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ এখন এমন একটি ভারসাম্য খুঁজছে, যেখানে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রক্ষা করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্কও বজায় রাখা সম্ভব হবে।

ঐক্য ধরে রাখাই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য
সম্মেলনের আগে ন্যাটো নেতৃত্ব এবং আয়োজক দেশ উভয়ই জোটের ঐক্য ও সংহতির ওপর জোর দিয়েছে। তাদের মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন এড়িয়ে যৌথ অবস্থান বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
এ কারণে এবারের সম্মেলনে নতুন বড় উদ্যোগ ঘোষণার চেয়ে সদস্য দেশগুলোর প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদারের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের পথ আরও কঠিন
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে ন্যাটোর সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও বেশি স্বার্থনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিনের পারস্পরিক আস্থা ও অভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
একই সময়ে ইউরোপ নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে গেলেও সামরিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা সক্ষমতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমানো সহজ হবে না। ফলে ন্যাটোর ভেতরে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সদস্য দেশগুলোর স্বার্থের সমন্বয় ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















