এক বছর আগে দীর্ঘদিনের দুই-সন্তান নীতি বাতিল করার পর এবার জন্মহার বাড়াতে নতুন প্রণোদনা চালু করেছে ভিয়েতনাম। দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং কমে আসা জন্মহার মোকাবিলায় দেশটির সরকার নতুন জনসংখ্যা আইন কার্যকর করেছে, যার আওতায় দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দিলে মায়েরা অতিরিক্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি, স্বাস্থ্যসেবা এবং আর্থিক সহায়তা পাবেন।
বুধবার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন আইনে দ্বিতীয় সন্তানের মা হলে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস থেকে বাড়িয়ে সাত মাস করা হয়েছে। পাশাপাশি গর্ভকালীন ও নবজাতকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ভর্তুকির আওতায় আনা হয়েছে। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে মায়েরা এককালীন নগদ সহায়তাও পাবেন, যার পরিমাণ সর্বোচ্চ ২২৮ মার্কিন ডলার। এটি দেশটির গড় মাসিক আয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমান।
হ্যানয়ের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী নগুয়েন কিম বিচ বলেন, দ্বিতীয় সন্তান নিলে অতিরিক্ত এক মাস শিশুর সঙ্গে বাড়িতে থাকতে পারবেন। তাঁর স্বামীও আরও কিছুদিন ছুটি নিতে পারবেন। তবে তিনি মনে করেন, এই সুবিধা বাস্তবে দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত বদলানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)-এর ভিয়েতনাম কার্যালয়ের জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ফাম থি লান বলেন, এটি সরকারের নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আগে পরিবার পরিকল্পনার মাধ্যমে জন্ম নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়া হলেও এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জনসংখ্যার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে।
গত বছর পর্যন্ত ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা তৃতীয় সন্তান নিলে শাস্তির মুখে পড়তেন। কিন্তু এখন সরকার উল্টো মানুষকে আরও সন্তান নিতে উৎসাহিত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিয়েতনামে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, কিন্তু জন্মহার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ফলে দেশটি বিশ্বের দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোর একটি হয়ে উঠছে। এতে ভবিষ্যতে শ্রমশক্তির সংকট এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বর্তমানে ভিয়েতনামের জন্মহার প্রতি নারীর ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৯৩, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় ২ দশমিক ১-এর নিচে। একই সময়ে গড় আয়ু বেড়ে প্রায় ৭৫ বছরে পৌঁছেছে এবং ৬০ বছরের বেশি মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও বেশি।
সরকারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের অনুপাত ২৫ শতাংশে পৌঁছাবে এবং এরপর দেশটির মোট জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে।

অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ, ভিয়েতনাম এখনও উন্নয়নশীল দেশ। মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৫ হাজার মার্কিন ডলার, যা একই পর্যায়ের জনসংখ্যাগত অবস্থায় থাকা জাপানের তুলনায় অনেক কম ছিল। ফলে ধনী হওয়ার আগেই বার্ধক্যজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে দেশটিকে।
বিশ্বব্যাংক আগেই সতর্ক করেছিল, দ্রুত সংস্কার না করলে ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে যেতে পারে। তাই সরকার নতুন জনসংখ্যা আইনকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
তবে ইউএনএফপিএর মতে, শুধু এককালীন নগদ সহায়তা যথেষ্ট নয়। শিশু লালন-পালনের পুরো সময়জুড়ে ধারাবাহিক সহায়তা না থাকলে উচ্চ আবাসন ব্যয়, শিশুর পরিচর্যার খরচ এবং জীবনযাত্রার চাপ মানুষের সন্তান নেওয়ার আগ্রহ কমিয়েই রাখবে।
সম্প্রতি সরকারি এক জরিপেও দেখা গেছে, বিবাহিতদের ৭৩ শতাংশ মনে করেন, সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে আয়ের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
হ্যানয়ের ২৪ বছর বয়সী ক্যাশিয়ার ত্রান মিন আনহ, যিনি মাসে প্রায় ৩৮০ ডলার আয় করেন, বলেন তিনি কোনো সন্তানই নিতে চান না। তাঁর ভাষায়, আর্থিক ও মানসিক চাপের কারণে আরেকজন মানুষের দায়িত্ব নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
![]()
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















