বিশ শতকের শুরুতে কানাডা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিজস্ব পরিচয় খুঁজে পেলেও শিল্পকলায় তখনও স্পষ্ট জাতীয় স্বাতন্ত্র্য গড়ে ওঠেনি। ঠিক সেই সময় একদল শিল্পীর সাহসী উদ্যোগ দেশটির শিল্পচর্চায় নতুন দিগন্তের সূচনা করে। তাদের আঁকা প্রকৃতির ছবি শুধু দর্শকদের মুগ্ধই করেনি, বরং বিশ্বের সামনে কানাডাকে এক নতুন দৃষ্টিতে তুলে ধরেছিল।
নতুন শিল্পভাবনার সূচনা
এই শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন ভার্লি, ফ্র্যাঙ্কলিন কারমাইকেল, লরেন হ্যারিস, এ. ওয়াই. জ্যাকসন, ফ্রানৎস জনস্টন, আর্থার লিসমার এবং জে. ই. এইচ. ম্যাকডোনাল্ড। তাদের পাশাপাশি টম থমসন ছিলেন অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলটি গঠনের আগেই মারা যান, তবু তার শিল্পভাবনা পরবর্তী প্রজন্মের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
থমসনের ‘দ্য জ্যাক পাইন’ ও ‘দ্য ওয়েস্ট উইন্ড’ এবং হ্যারিসের ‘নর্থ শোর, লেক সুপিরিয়র’-এর মতো চিত্রকর্ম আজও কানাডার জাতীয় শিল্পের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেকের কাছে এগুলোই দেশের প্রকৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্পরূপ।

এক প্রদর্শনী বদলে দেয় দৃষ্টিভঙ্গি
এই শিল্পীরা ১৯১০-এর দশকে কাজ শুরু করেন। সে সময় কানাডা নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলার পথে এগোচ্ছিল। কিন্তু শিল্পকলায় আধুনিক জাতীয় ভাষা তখনও তৈরি হয়নি।
পরিবর্তনের বড় মুহূর্ত আসে ১৯১৩ সালে। ম্যাকডোনাল্ড ও হ্যারিস যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো শহরে সমকালীন স্ক্যান্ডিনেভীয় শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী দেখেন। তখন নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডও নিজেদের স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলছিল। তাদের শিল্পে উজ্জ্বল রং, সরল বিন্যাস এবং বিস্তীর্ণ প্রকৃতির উপস্থাপনায় আধুনিক জাতীয় চেতনার প্রকাশ দেখে কানাডীয় শিল্পীরাও নতুন পথের সন্ধান পান।
প্রকৃতিকে অনুভূতির ভাষায় তুলে ধরা
এই শিল্পীদের লক্ষ্য ছিল প্রকৃতিকে হুবহু অনুকরণ করা নয়। বরং প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে যে অনুভূতি, নিঃসঙ্গতা, বিস্ময় ও আবেগ জন্ম নেয়, সেটিকেই ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা।

তারাভরা আকাশ, বাতাসে দুলতে থাকা পাইনগাছ কিংবা বিস্তীর্ণ নির্জন অরণ্য তাদের ছবিতে শুধু দৃশ্য হিসেবে নয়, এক ধরনের মানসিক অভিজ্ঞতা হিসেবে উঠে এসেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাদের শিল্পকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
টম থমসনের অনন্য প্রভাব
স্বশিক্ষিত শিল্পী ও নকশাকার টম থমসন নিয়মিত ক্যানো নিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়তেন কানাডার বন্য প্রকৃতির ভেতর। সেখানে বসেই তিনি আঁকতেন ও স্কেচ করতেন। প্রকৃতির সঙ্গে তার এই প্রত্যক্ষ সম্পর্ক পরবর্তী শিল্পীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
বিশেষ করে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা গাছের প্রতীকী ব্যবহার এবং কানাডার বন্য প্রকৃতিকে আধুনিক শিল্পের বিষয় হিসেবে তুলে ধরার পথ তিনি দেখিয়ে দেন। তার প্রভাবেই পরবর্তী শিল্পীরা বুঝতে পারেন, দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং আধুনিক জাতীয় পরিচয়েরও শক্তিশালী প্রতীক হতে পারে।
আজও প্রায় এক শতাব্দী পর এই শিল্পীদের সৃষ্টি কানাডার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাদের তুলিতে আঁকা প্রকৃতি শুধু শিল্পের ইতিহাসই বদলায়নি, বিশ্বের কাছে কানাডার পরিচয়কেও নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















