হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে গিয়ে ইরান এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, যা চলমান যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনাকে নতুন করে সংকটে ফেলতে পারে।
শান্তি সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা
গত ১৭ জুন দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল শান্তি আলোচনার ভিত্তি তৈরি করা এবং এপ্রিল থেকে কার্যকর থাকা নাজুক যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা। ওই সমঝোতার মূল বিষয় ছিল, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার বিনিময়ে ইরান অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সমঝোতা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তেহরানে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।
ট্যাংকারে হামলা ও পাল্টা সামরিক অভিযান

মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটে। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার না করলেও এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র রাতভর ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আরও ব্যাপক বিমান হামলা চালায়।
অন্যদিকে, ইরান পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়ানোর হুমকি দেয়। একই সঙ্গে উভয় পক্ষই শান্তি সমঝোতা বাতিলের ইঙ্গিত দেয়, যা উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ
ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ওমান উপকূলঘেঁষা দক্ষিণ দিকের রুট ব্যবহার করতে উৎসাহ দিচ্ছে। এতে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নতুন ট্রানজিট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জাহাজ নিবন্ধন ও সম্ভাব্য ফি আদায়ের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে তেহরান মনে করছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে প্রণালিতে দৈনিক জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
চাপ বাড়াচ্ছে আঞ্চলিক পরিস্থিতি

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে পৃথক শান্তি উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, যার অন্যতম লক্ষ্য হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের পথ তৈরি করা। হিজবুল্লাহকে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ ছাড়া ইরানের জন্য সম্ভাব্য আর্থিক সহায়তার পরিমাণ নিয়েও আলোচনা সংকুচিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ইরানের হিসাব
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে নিজেদের টিকে থাকার অভিজ্ঞতা ইরানের নেতৃত্বকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির যুদ্ধকালীন মৃত্যুর পর চলমান শোকানুষ্ঠানের মধ্যেও হামলার সময় নির্ধারণকে অনেকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখছেন।
অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী মহল দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিরোধিতা করে আসছে। ফলে সমঝোতা স্মারক থেকে সরে আসার দাবিও জোরালো হয়েছে।

তবে কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করছেন, উভয় পক্ষই সামরিক চাপ ও কঠোর বক্তব্যকে আলোচনার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছেন, একে অপরের রাজনৈতিক অবস্থান ভুলভাবে মূল্যায়ন করলে পরিস্থিতি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
ইতিহাসও সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জিম্মি সংকট কিংবা ইরান-ইরাক যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার মতো ঘটনাগুলো দেখায়, তেহরান অতীতেও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের আশায় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিতে পিছপা হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা আবারও বাড়ছে। শান্তি সমঝোতা টিকবে নাকি নতুন সংঘাত শুরু হবে, তা এখন দুই পক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















