ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখে এমন কয়েকটি ব্যবস্থা বদলাতে বলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। শুক্রবার প্রকাশিত প্রাথমিক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, স্বয়ংক্রিয় ভিডিও, অসীম স্ক্রল ও অতিব্যক্তিকেন্দ্রিক সুপারিশ ব্যবহারকারীদের বাধ্যতামূলক ব্যবহারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষভাবে শিশু ও ঝুঁকিতে থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতার কথা তুলেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। দুই বছর ধরে চলা তদন্তের পর এই আসক্তিকর নকশা নিয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো হলো। অভিযোগ চূড়ান্ত হলে মেটাকে বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ জরিমানা দিতে হতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
তদন্তটি হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সেবা আইনের অধীনে। এই আইন বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে ক্ষতিকর বিষয়বস্তু ও ব্যবস্থাগত ঝুঁকি কমানোর দায় দেয়। কমিশনের মতে, নতুন ভিডিও শেষ হলেই আরেকটি ভিডিও চালু হওয়া ব্যবহারকারীর সচেতন সিদ্ধান্তের সুযোগ কমায়। একইভাবে অসীম স্ক্রলে থামার কোনো স্বাভাবিক বিন্দু থাকে না। রিল ও স্টোরির ধারাবাহিক প্রবাহও অতিরিক্ত ব্যবহারে ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়ন্ত্রকের ভাষ্য, মেটা আসক্তিকর নকশা থেকে তৈরি ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি। সময় নিয়ন্ত্রণের সুবিধা সহজে উপেক্ষা করা যায়। অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ চালু করতেও সময়, পরিশ্রম ও কারিগরি জ্ঞান লাগে।
ইউরোপীয় কমিশন চায়, স্বয়ংক্রিয় ভিডিও এবং অসীম স্ক্রল শুরু থেকেই বন্ধ থাকুক। ব্যবহারকারী চাইলে পরে সেগুলো চালু করতে পারবেন। কার্যকর বিরতি, সহজ সময়সীমা এবং কম আসক্তিনির্ভর সুপারিশ ব্যবস্থাও চেয়েছে কমিশন। মেটা অবশ্য প্রাথমিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কিশোরদের সুরক্ষায় নেওয়া সাম্প্রতিক পদক্ষেপ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। তাদের কিশোর অ্যাকাউন্টে রাতের ব্যবহার বন্ধ করা এবং দৈনিক সময় ১৫ মিনিটে সীমিত করার সুযোগ রয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রকের প্রশ্ন হলো, সুরক্ষার দায় কেন ব্যবহারকারী বা অভিভাবকের ওপর থাকবে। আসক্তিকর নকশা যদি মূল ব্যবস্থার অংশ হয়, তাহলে ঐচ্ছিক নিয়ন্ত্রণ একা যথেষ্ট নাও হতে পারে।

বাংলাদেশে ফেসবুক দৈনন্দিন যোগাযোগ, সংবাদ, বিনোদন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই ইউরোপের সিদ্ধান্তটি কেবল বিদেশি প্রযুক্তি আইনের খবর নয়। একই নকশা বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের কাছেও পৌঁছায়। শিশু কত রাত পর্যন্ত রিল দেখছে অথবা একটি ভিডিও থেকে আরেকটিতে যাচ্ছে, সেটি শুধু পারিবারিক শাসনের প্রশ্ন নয়। প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়িক নকশাও এখানে সক্রিয়। বাংলাদেশে অনলাইন নিরাপত্তার আলোচনা সাধারণত ক্ষতিকর পোস্ট, প্রতারণা বা ব্যক্তিগত তথ্য ঘিরে হয়। ব্যবহারকারীকে কতক্ষণ আটকে রাখা হচ্ছে, সেই ব্যবস্থাগত প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম আসে। ইউরোপের পদক্ষেপ আসক্তিকর নকশাকে ভোক্তা সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয় হিসেবে দেখার নতুন ভিত্তি দিচ্ছে।
মেটা এখন অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ পাবে। এরপর কমিশন কয়েক মাসের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একই সঙ্গে অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীকে একই ধরনের বিষয়ের গভীরে টেনে নেয় কি না, তার আলাদা তদন্ত চলছে। ১৩ বছরের কম বয়সীদের প্রবেশ ঠেকানোর ব্যবস্থাও পর্যালোচনায় রয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সংখ্যা তাই কেবল ৬ শতাংশ জরিমানা নয়। ১৫ মিনিটের ঐচ্ছিক সীমা আর সারাক্ষণ চালু থাকা অসীম স্ক্রলের মধ্যে কার সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পাবে, সেটিই মূল পরীক্ষা। আগামী সিদ্ধান্তে দেখা যাবে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে শুধু সতর্কতা দেখাতে বলা হবে, নাকি পণ্যের নকশাই বদলাতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















