ইউক্রেনের জন্য ২০২৬ সালে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ইউরোর সামরিক সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত জোটের শীর্ষ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা, গোলাবারুদ সরবরাহ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও সামনে আনা হয়েছে। ন্যাটোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের প্রতিরোধ সক্ষমতা ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় কিয়েভের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য এই সহায়তা জরুরি। তবে রাশিয়া এই সিদ্ধান্তকে সংঘাত দীর্ঘায়িত করার পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
প্রস্তাবিত সহায়তা প্যাকেজের মধ্যে গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ এবং ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। সম্মেলনে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে এই ব্যবস্থার উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে, কারণ রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে প্যাট্রিয়ট ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সময় লাগবে, কারণ প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষিত জনবল, নিরাপদ কারখানা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের ব্যবস্থা স্থানীয়ভাবে তৈরি করা সহজ নয়।
ইউক্রেনকে সহায়তার প্রশ্নে ন্যাটোর সদস্যরা মোটামুটি একমত হলেও অর্থায়নের পরিমাণ ও পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্র জানিয়েছে, তারা ৭০ বিলিয়ন ইউরোর নির্দিষ্ট প্যাকেজে অংশ নেবে না এবং নিজস্ব বাজেট ও প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করেছে। অন্য কয়েকটি দেশও সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষে থাকলেও নিজেদের অবদান নির্ধারণে বাড়তি সময় চেয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন সরকার এখন একই সঙ্গে ইউক্রেনকে সহায়তা, নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চাপ সামলাচ্ছে। সম্মেলনে সদস্যদেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় দেশগুলোকে জাতীয় আয়ের বড় অংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেনে নতুন অস্ত্র পাঠানো হলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হবে এবং শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা দুর্বল হবে। মস্কো সতর্ক করেছে, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে ন্যাটো বলছে, সামরিক সহায়তা কমিয়ে দিলে রাশিয়া নতুন করে ভূখণ্ড দখলের সুযোগ পাবে, আর দুর্বল অবস্থায় ইউক্রেনকে আলোচনায় বসানো হলে কোনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। এই অবস্থানের পার্থক্যই যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানকে কঠিন করে তুলছে, আর দুই পক্ষই আলোচনার কথা বললেও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব ইউরোপের নিরাপত্তার বাইরে খাদ্য, সার, জ্বালানি এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন বাজারেও পড়েছে। কৃষ্ণসাগরীয় বাণিজ্যে নতুন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে গম, সূর্যমুখী তেল ও সারের দাম আবার বাড়তে পারে। ইউক্রেনকে নতুন সহায়তার ঘোষণা যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে আরও দীর্ঘ সময় চলার ইঙ্গিত দিচ্ছে, আর এখন নজর থাকবে সদস্যদেশগুলো কত দ্রুত প্রতিশ্রুত অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করতে পারে, এবং চেক প্রজাতন্ত্রের মতো আরও কোনো সদস্যদেশ শেষ পর্যন্ত এই প্যাকেজ থেকে সরে দাঁড়ায় কি না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















