দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রা পাওয়ায় দেশটির অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিনের উচ্চ বেকারত্ব, অপরাধ এবং দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ বাড়লেও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, বিপুলসংখ্যক বিদেশি শ্রমিক দেশ ছেড়ে চলে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই শ্রমবাজার ও ব্যবসাই, যেগুলোকে রক্ষা করার দাবিতে আন্দোলন চলছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশজুড়ে অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র হয়েছে। গত ৩০ জুন দেশব্যাপী বিক্ষোভের পর অনেক বিদেশি নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়তে শুরু করেছেন। যদিও অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ছিল, তবু সহিংসতার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণ, কৃষি, খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, আতিথেয়তা খাত এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। এই শ্রমিকরা চলে গেলে বিভিন্ন খাতে জনবল সংকট দেখা দিতে পারে, যা উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অনেক বিদেশি নাগরিক নিজেরাও ছোট ব্যবসা পরিচালনা করেন, এসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান হয় এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ায় ভোক্তারাও উপকৃত হন, তাই অভিবাসী শ্রমিকের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করলে তার অনাকাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে বিদেশি মালিকানাধীন ছোট মুদি ও পাড়ার দোকান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব দোকান পাইকারি সরবরাহকারী, বাড়িওয়ালা এবং স্থানীয় কর্মীদের আয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সাম্প্রতিক বিক্ষোভের প্রভাব ইতোমধ্যে খুচরা বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। দেশের অন্যতম বড় অনলাইন মুদি পণ্য সরবরাহ সেবার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়েছে, কারণ প্রতিষ্ঠানটির চালকদের বড় অংশই বিদেশি হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা কয়েক বছর ধরেই ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সমস্যায় ভুগছে। সর্বশেষ পূর্বাভাসে চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আরও কমে এসেছে, আর বেকারত্বের হার প্রায় এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে, ফলে প্রায় ৮১ লাখ মানুষ কাজের বাইরে রয়েছেন। এই বাস্তবতা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ বাড়িয়ে তুললেও শ্রমবাজার নিয়ে করা গবেষণাগুলো ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। সেখানে দেখা গেছে, বিদেশি শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়লে স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পায়, অর্থাৎ বিদেশি শ্রমিক সবসময় স্থানীয়দের চাকরি কেড়ে নেন এমন ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত আর্থিক বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও পরিস্থিতি নতুন ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে বিক্ষোভ, ব্যবসা বন্ধ, সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং লুটপাটের মতো ঘটনা বাড়লে অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে শুধু দক্ষিণ আফ্রিকাই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর অর্থনীতিও প্রভাবিত হতে পারে, কারণ দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মরত অভিবাসীরা নিয়মিত নিজ নিজ দেশে অর্থ পাঠান, যা বহু পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। অর্থনীতিবিদদের মতে, সেই অনলাইন মুদি সরবরাহ সেবার সাম্প্রতিক ব্যাঘাতই আসলে দেখিয়ে দিচ্ছে, অভিবাসীদের ভূমিকা উপেক্ষা করে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















