বিশ্ব ফুটবলে রেফারিংয়ের ভুল কমাতে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হলেও ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে সেই প্রযুক্তিই এখন সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রে। বিশেষ করে ভিডিও সহকারী রেফারি (ভিএআর), বলের সেন্সর প্রযুক্তি এবং নতুন পর্যালোচনা পদ্ধতি নিয়ে খেলোয়াড়, কোচ ও সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। অনেকের অভিযোগ, প্রযুক্তির প্রয়োগে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে, আবার কেউ কেউ বলছেন, অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ম্যাচের স্বাভাবিক গতি নষ্ট করছে।
একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মিসরের ম্যাচে ভিএআরের সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। মিসরের একটি গোল বাতিল করা হয় আক্রমণ শুরুর আগে হওয়া একটি ফাউলের কারণে। একই ম্যাচে সম্ভাব্য একটি পেনাল্টির আবেদনও পর্যালোচনা করা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেয় মিসর।
ম্যাচ শেষে মিসরের কোচ হোসাম হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাঠে যা ঘটছে তা ন্যায্য নয়। তার মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার সব দলের ক্ষেত্রে একইভাবে হচ্ছে না।
ফিফার অবস্থান
![]()
ফিফার রেফারিং বিভাগের প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা অবশ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার ব্যাখ্যায়, গোলের আগে যত দূরেই বা যত আগেই ফাউল হোক না কেন, সেটি যদি মাঠের রেফারির চোখ এড়িয়ে যায়, তাহলে ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারে। তার মতে, ফাউল মানেই ফাউল এবং নিয়ম প্রয়োগে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট দূরত্ব বা সময়সীমা নেই।
বাড়ানো হয়েছে ভিএআরের ক্ষমতা
এবারের বিশ্বকাপে ভিএআরের ভূমিকা আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ম প্রণয়নকারী সংস্থার সহযোগিতায় ভিএআরকে অতিরিক্ত কয়েকটি পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ম্যাচে প্রযুক্তিগত পর্যালোচনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের তুলনায় এবার ভিএআরের হস্তক্ষেপ অনেক বেশি হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, প্রযুক্তি কি এখন রেফারির সহায়ক, নাকি ম্যাচ পরিচালনার মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠছে।
বলের সেন্সরও তৈরি করেছে নতুন প্রশ্ন
ক্রোয়েশিয়া ও পর্তুগালের ম্যাচেও প্রযুক্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক দেখা দেয়। অতিরিক্ত সময়ে ক্রোয়েশিয়ার সমতাসূচক গোল বাতিল হয়, কারণ বলটি গোলদাতার সতীর্থের শরীরের সামান্য স্পর্শে অফসাইড পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে সেন্সর শনাক্ত করে। খালি চোখে সেই স্পর্শ বোঝা যায়নি এবং বলের গতিপথেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন ছিল না।

ক্রোয়েশিয়ার অভিজ্ঞ ফুটবলার লুকা মদরিচ মনে করেন, প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রে উপকারী হলেও এর ব্যবহার সব সময় সঠিক বা সমানভাবে হচ্ছে না। তার মতে, একেবারে স্পষ্ট ভুল না হলে ভিএআরের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চেয়ে ক্রোয়েশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনও ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে। তাদের দাবি, এটি প্রযুক্তির অপব্যবহারের একটি উদাহরণ।
লাল কার্ড ও সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া
এবারের বিশ্বকাপে লাল কার্ডের সংখ্যাও আগের দুটি আসরের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে মাঠের রেফারি যে সিদ্ধান্ত দেননি, পরে ভিএআরের সহায়তায় তা পরিবর্তন হয়েছে। এমন কিছু বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে, যা অতীতে ভিএআর না থাকলে হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না।
প্রযুক্তির বাড়তি ব্যবহার নিয়ে মাঠের দর্শকদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেক সমর্থক মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার কারণে খেলার স্বাভাবিক উত্তেজনা কমে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবলে প্রযুক্তি এখন অপরিহার্য হলেও সেটির সীমা কোথায় হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নই ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আলোচনায় পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি যেন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, কিন্তু খেলাটির স্বাভাবিক প্রবাহ ও আবেগ নষ্ট না করে—এমন ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















