কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সর্বশেষ টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে মাইক্রোসফট জানিয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরে তাদের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এআই ডেটা সেন্টারের ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নীতিগত পরিবর্তন এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিঃসরণ বেড়েছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারও ঊর্ধ্বমুখী
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে মাইক্রোসফটের মোট কার্বন নিঃসরণ দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য। কার্বন অপসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ বিবেচনায় নেওয়ার পর নিট নিঃসরণ দাঁড়ায় ২ কোটি মেট্রিক টনে, যা আগের অর্থবছরের ১ কোটি ৬০ লাখ মেট্রিক টনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
একই সময়ে কোম্পানিটির বিদ্যুৎ ব্যবহারও ২৪ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তির জন্য বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রয়োজন হওয়ায় নতুন নতুন ডেটা সেন্টারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণে।
২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ
মাইক্রোসফট কয়েক বছর আগে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নেগেটিভ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন।
তাদের ভাষ্য, এআই অবকাঠামোর সম্প্রসারণ যে গতিতে এগোচ্ছে, সেই তুলনায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও টেকসই সমাধানের উন্নয়ন যথেষ্ট দ্রুত হচ্ছে না। ফলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং জলবায়ু লক্ষ্য—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নীতিগত পরিবর্তনেরও প্রভাব
কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে মাইক্রোসফট জানিয়েছে, তারা স্বল্পমেয়াদি কিছু নবায়নযোগ্য জ্বালানি সনদ কেনা বন্ধ করেছে। এর পরিবর্তে এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে, যেগুলো বিদ্যুৎ গ্রিডে নতুন পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ যোগ করবে।
কোম্পানিটি বলছে, কার্বন অপসারণ, কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ, টেকসই নির্মাণসামগ্রী এবং বিকল্প জ্বালানিকে সমন্বয় করেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ইতিবাচক অগ্রগতিও রয়েছে
নিঃসরণ বাড়লেও কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। মাইক্রোসফট জানিয়েছে, তাদের বার্ষিক বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছে।
এছাড়া প্রথমবারের মতো তারা যত মিঠাপানি ব্যবহার করেছে, তার চেয়েও বেশি পানি প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দিয়েছে। এই পরিমাণ ১ কোটি ৪০ লাখ ঘনমিটারেরও বেশি। পাশাপাশি অবসরে যাওয়া ক্লাউড সার্ভারের ৯২ শতাংশ পুনর্ব্যবহার বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। বর্তমানে ২৬টি দেশে কোম্পানিটির পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির সক্ষমতা ৪০ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যার মধ্যে ১৯ গিগাওয়াট ইতোমধ্যে কার্যক্রমে রয়েছে।
শুধু মাইক্রোসফট নয়
বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি এখন একটি সাধারণ প্রবণতা হয়ে উঠছে। এআই অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ছে এবং জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে প্রযুক্তি খাতের জন্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা আগামী কয়েক বছরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
মাইক্রোসফটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















