শিশুর জন্মের পরই তার পুরো জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হলে কি বিরল রোগ আগেভাগে শনাক্ত করে জীবন বাঁচানো সম্ভব? নাকি এতে পরিবারকে অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগে ফেলবে এবং ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হবে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্যের বিশাল ভান্ডার? এই প্রশ্নকে ঘিরেই বিশ্বজুড়ে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে নবজাতকের জিনোম বিশ্লেষণ নিয়ে একাধিক গবেষণা চলছে। লক্ষ্য হলো জন্মের পরপরই জিনগত রোগ শনাক্ত করা, দ্রুত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা।
রোগ শনাক্তে নতুন সম্ভাবনা
অনেক দেশেই জন্মের পর শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে কিছু নির্দিষ্ট জিনগত রোগ শনাক্ত করা হয়। তবে জিনোম বিশ্লেষণের মাধ্যমে শুধু কয়েকটি নয়, শত শত রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। এর ফলে এমন অনেক রোগও আগেভাগে ধরা পড়তে পারে, যা শৈশবে বা পরবর্তী জীবনে দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা শুরু করাও সহজ হয়। এতে শিশুর সুস্থ জীবনযাপনের সম্ভাবনা বাড়ে এবং অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
সব জিনগত পরিবর্তন কি রোগে রূপ নেয়?
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, কোনো জিনগত পরিবর্তন পাওয়া গেলেই যে সেই ব্যক্তি অবশ্যই রোগে আক্রান্ত হবেন, এমন নয়। পরিবেশ, অন্যান্য জিনের প্রভাব এবং নানা জৈবিক কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভাব্য রোগ কখনো প্রকাশ পায় না।
এই বাস্তবতা অনেক সময় পরিবারকে অযথা উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করছেন, শত শত সম্ভাব্য ঝুঁকি জানার ফলে এমন অনেক শিশুকে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণে রাখা হতে পারে, যারা শেষ পর্যন্ত কখনো অসুস্থই হবে না।
চিকিৎসার সিদ্ধান্তেও তৈরি হতে পারে দ্বিধা
কিছু ক্ষেত্রে জিনগত ঝুঁকি ধরা পড়লে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষাই যথেষ্ট। কিন্তু অন্য কিছু রোগে প্রতিরোধমূলক অস্ত্রোপচার বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। পরে যদি দেখা যায়, সেই রোগের সম্ভাবনা ধারণার চেয়ে অনেক কম ছিল, তাহলে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসার প্রশ্নও সামনে আসে।
এ কারণে অনেক গবেষকের মত, আপাতত শুধু সেসব জিনগত পরিবর্তনের তথ্য দেওয়া উচিত, যেগুলোর ক্ষেত্রে কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে এবং যেগুলোর ঝুঁকি বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত।
গবেষণার জন্য তথ্য সংরক্ষণ নিয়ে বিতর্ক

বেশিরভাগ কর্মসূচির আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো নবজাতকের জিনগত তথ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা। এই তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতে নতুন রোগ শনাক্ত, ওষুধের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ফলে ভবিষ্যতে আজকের সংরক্ষিত জিনগত তথ্য থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য বের করে আনা সম্ভব হবে।
তবে এই আশার পাশাপাশি রয়েছে গোপনীয়তার বড় প্রশ্ন। একজন মানুষের জিনগত তথ্য তার সবচেয়ে ব্যক্তিগত তথ্যগুলোর একটি। অতীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জিনগত তথ্য ফাঁসের ঘটনা দেখিয়েছে, এমন তথ্য ভুল হাতে গেলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, বৈষম্য কিংবা আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নৈতিক প্রশ্নের মুখে নতুন উদ্যোগ
আরেকটি বিতর্ক হলো, অনেক কর্মসূচিতে রোগ শনাক্তকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংরক্ষণ একই সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়। ফলে অভিভাবকেরা চাইলে শুধু স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে গবেষণায় অংশ না নেওয়ার সুযোগ সব সময় পান না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগ নির্ণয়ের সুবিধা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে যেহেতু নবজাতক নিজের সম্মতি দেওয়ার অবস্থায় থাকে না, তাই এই ধরনের কর্মসূচি পরিচালনায় নৈতিকতা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং অভিভাবকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
জিনোম বিশ্লেষণ ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















