বিশ্ব অর্থনীতি আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে যুদ্ধ আর কেবল সীমান্তে সৈন্য মোতায়েন বা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক নীতি, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর কর্তৃত্ব—এসবও এখন আন্তর্জাতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠছে। ফলে বিশ্ব এমন এক যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে সামরিক ও অর্থনৈতিক সংঘাত একে অপরকে ক্রমাগত শক্তিশালী করছে।
গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ খুব কম। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা শুল্কনীতি—সব মিলিয়ে এগুলো একই বৃহত্তর পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ব অর্থনীতির ভিত্তি ছিল উন্মুক্ত বাণিজ্য, আন্তঃনির্ভরতা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা বহু দেশের উন্নয়নের পথ খুলে দেয়। বাণিজ্যের প্রসার ঘটে, বিনিয়োগ বাড়ে, কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসে এবং অর্থনৈতিক সংযোগ আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখে।
কিন্তু সেই ব্যবস্থার মধ্যেই একটি অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ছিল। দেশগুলো যত বেশি পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হয়েছে, ততই তারা নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, জ্বালানি, আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর কিংবা বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রগুলোতে নির্ভরতা অনেক সময় রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন আর কেবল পারস্পরিক লাভের বিষয় নয়; এটি নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ।
বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্যও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কয়েক দশক আগে যেখানে একটি দেশ বা সীমিত কয়েকটি উন্নত অর্থনীতি বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্র ছিল, সেখানে এখন নতুন শক্তির উত্থান ঘটেছে। চীনের উত্থান সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ হলেও, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপের বহু দেশও বৈশ্বিক উৎপাদন ও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। এটি অর্থনৈতিক বিকাশের স্বাভাবিক ফল, কিন্তু একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই নতুন বাস্তবতায় বড় শক্তিগুলো নিজেদের কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করতে নানা ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। শুল্ক বৃদ্ধি, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, শিল্পে সরকারি ভর্তুকি, প্রযুক্তি স্থানান্তরে বিধিনিষেধ এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ—এসব পদক্ষেপকে এখন অনেক দেশ জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখছে। কিন্তু একটি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা অন্য দেশের মধ্যে একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করছে। ফলে সবাই নিজেদের আরও বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করছে।
এভাবেই একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হয়। ঝুঁকি কমানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া নীতি বৈশ্বিক সংযোগকে দুর্বল করে। সংযোগ দুর্বল হলে পারস্পরিক আস্থা কমে যায়। আস্থা কমে গেলে নতুন করে আরও সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতার জায়গায় প্রতিযোগিতা, আর প্রতিযোগিতার জায়গায় মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়।
এই পরিবর্তনের অর্থ শুধু ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়। সরবরাহ শৃঙ্খল বিভক্ত হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা বাড়ে এবং ছোট ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় তারা প্রায়ই বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ হারায়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনাকেও উসকে দিতে পারে। যখন বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অর্থায়নকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ভুল বোঝাবুঝি কিংবা সীমিত সংঘর্ষও দ্রুত বৃহত্তর সংকটে রূপ নিতে পারে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে নেওয়া পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক বৈশ্বিক নিরাপত্তাকেই দুর্বল করে দিতে পারে।
তাই আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নয়, বরং এমন একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো রক্ষা করা, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা সহযোগিতাকে ধ্বংস করবে না। বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব বাস্তবতা হলেও সেটিকে সংঘাতের বিশ্বে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করা আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
বিশ্ব অর্থনীতি এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে পথ দুটি—একদিকে ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস, বিভাজন ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা; অন্যদিকে নতুন বাস্তবতাকে স্বীকার করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নিয়মগুলোকে পুনর্গঠন করা। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দশকের বৈশ্বিক নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ।
পিয়ের-অলিভিয়ে গুরিঞ্চাস 


















