ডিজিটাল যুগে জন্ম নেওয়া জেন-জেড প্রজন্মকে এত দিন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সমর্থক হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সেই ধারণায় এখন পরিবর্তন আসছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে অনেক তরুণ। ফলে তাদের একাংশ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাস্তব জীবনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন।
সম্প্রতি নিউইয়র্কে আয়োজিত এক সপ্তাহব্যাপী একটি প্রযুক্তিবিরোধী উৎসব এই পরিবর্তিত মানসিকতাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। সেখানে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো প্রচার চালানো হয়নি। অংশগ্রহণকারীদের আকৃষ্ট করতে আয়োজকেরা ভরসা করেছিলেন পোস্টার ও মুখে মুখে প্রচারের ওপর। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা খুব বেশি না হলেও উপস্থিতদের বেশিরভাগই ছিলেন বিশের কোঠার তরুণ-তরুণী।
প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি বাড়ছে উদ্বেগ
স্মার্টফোনের যুগেই বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম এখন প্রযুক্তির নেতিবাচক দিক নিয়েও নতুন করে ভাবছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ মনে করেন, স্মার্টফোন আবিষ্কার না হলেও ভালো হতো। আবার অর্ধেকেরও বেশি তরুণ ১৬ বছরের কমবয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধের পক্ষে মত দিয়েছেন।
অনেকেই নিজের স্ক্রিন-সময় কমানোর জন্য মোবাইল অ্যাপ মুছে ফেলছেন, ব্যবহার সীমিত করছেন বা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলছেন। কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারা থেকেই দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা
শুধু স্মার্টফোন নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেক তরুণের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে চাকরির বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করলেও তারা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্য নজরদারি, অ্যালগরিদমের অতিরিক্ত প্রভাব এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
অফলাইন জীবনের প্রতি বাড়ছে আগ্রহ
প্রযুক্তি থেকে কিছুটা দূরে থাকার এই প্রবণতার কারণে অনেকেই আবার পুরোনো ধরনের জীবনযাপনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। সাধারণ ফিচার ফোন ব্যবহার, ক্যাসেট টেপ শোনা কিংবা ডিজিটাল পর্দার বাইরে বই পড়া, বাগান করা, ধাঁধার সমাধানসহ নানা অফলাইন শখ আবার জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন ক্লাব ও সামাজিক উদ্যোগ মানুষকে কিছু সময়ের জন্য হলেও স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। মজার বিষয় হলো, বাস্তব জীবনে ফেরার এই বার্তাও অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনেই ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা এখন ধীরস্থির জীবনযাপন ও অফলাইন কর্মকাণ্ডকে আকর্ষণীয় জীবনধারা হিসেবে তুলে ধরছেন।
সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া কি সম্ভব?
তবে প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া এখনও সহজ নয়। প্রযুক্তিবিরোধী সেই উৎসবেও একজন অংশগ্রহণকারী স্বীকার করেন, তাদের দলের জন্য অন্তত একজনকে স্মার্টফোন ব্যবহার করতেই হতো, যাতে শহরে চলাচল বা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা যায়।
তারপরও এই প্রবণতার সমর্থকদের বিশ্বাস, প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমালে মানসিক স্বস্তি, মনোযোগ এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযোগ বাড়ে। কয়েক বছর আগে স্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়া এক তরুণ জানান, দীর্ঘদিন পর তিনি আবার মনোযোগ দিয়ে বই পড়তে পারছেন এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্তি অনুভব করছেন।
ডিজিটাল যুগের এই নতুন প্রবণতা দেখাচ্ছে, প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার নয়; বরং সচেতন, সংযত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ ব্যবহারই এখন অনেক তরুণের কাছে হয়ে উঠছে নতুন জীবনদর্শন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















