কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল বিনিয়োগ এখন শেয়ারবাজারের পাশাপাশি বন্ড বাজারেও বড় পরিবর্তন আনছে। ডেটা সেন্টার, উন্নত চিপ, ক্লাউড অবকাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে অর্থ জোগাতে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নজিরবিহীন পরিমাণ বন্ড বিক্রি করছে। ফলে চলতি বছরে করপোরেট বন্ড বাজার নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি বিপ্লবের সঙ্গে বন্ড বাজারের উত্থান
ইতিহাস বলছে, বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময় বন্ড বাজারও দ্রুত বিস্তৃত হয়। উনিশ শতকে রেলপথ নির্মাণের বিস্তার যেমন করপোরেট ঋণ বাজারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, তেমনি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারও একই ধরনের প্রবণতা তৈরি করছে।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল অর্থের প্রয়োজন মেটাতে বন্ড ইস্যু দ্রুত বাড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান শেয়ার বিক্রির চেয়ে বন্ডের মাধ্যমে বেশি অর্থ সংগ্রহ করছে, যা এই বাজারের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

বিপুল অর্থ সংগ্রহ করছে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান
চলতি বছরে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের বন্ড ছাড়ার পথে রয়েছে। বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট উচ্চমানের করপোরেট বন্ডের পরিমাণ কয়েকশ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর পাশাপাশি তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বন্ডের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
ডেটা সেন্টার, ক্লাউড সেবা এবং উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরিতে এই অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঋণ বাড়লেও বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা অটুট
প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনো শক্তিশালী। এর প্রধান কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের আয়, নগদ প্রবাহ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এখনো অনেক শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

ফলে করপোরেট বন্ডের ঝুঁকির যে অতিরিক্ত মূল্য বিনিয়োগকারীরা দাবি করেন, তা দীর্ঘ সময়ের তুলনায় এখনো নিচু অবস্থানেই রয়েছে। অর্থাৎ বাজার এখনো বিশ্বাস করছে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায় পরিশোধে সক্ষম থাকবে।
ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে সতর্ক হচ্ছে বিনিয়োগকারীরা
তবে সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকল্পকে একইভাবে দেখা হচ্ছে না। বড় ও প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি কোম্পানির তুলনায় ডেটা সেন্টার বা নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক কিছু প্রতিষ্ঠানের বন্ডে বিনিয়োগকারীরা এখন বেশি সতর্ক।
বিশেষ করে যেসব প্রকল্পের আয় ভবিষ্যতের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল, সেগুলোর বন্ডে তুলনামূলক বেশি সুদ দাবি করা হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাজার ধীরে ধীরে নিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে শুরু করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সতর্কবার্তা
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় না এলে বিপুল ঋণ পরিশোধে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সব সময় স্পষ্টভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে থাকে না। অনেক সময় যেসব সম্পদকে সবাই নিরাপদ মনে করে, সেখানেই আর্থিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। তাই শুধু প্রতিষ্ঠানের আকার নয়, দীর্ঘমেয়াদে তাদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করতে হবে।
সামনে কঠিন হবে সঠিক প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়া
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আজ যে প্রতিষ্ঠানকে বাজারের বিজয়ী মনে হচ্ছে, কয়েক বছরের মধ্যে তার অবস্থান বদলে যেতে পারে। আবার পিছিয়ে থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানও নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে সামনে চলে আসতে পারে।
এই বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এমন প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়া, যারা আগামী এক দশক, তিন দশক কিংবা তারও বেশি সময় পর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বন্ড বাজারে সুযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















