বিশ্বব্যাংক কয়েক বছর আগে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে ঋণ কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু এখন সেই অবস্থান থেকে বড় ধরনের সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। জলবায়ু-সম্পর্কিত ঋণের নির্দিষ্ট লক্ষ্য বাতিল হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের ভবিষ্যৎ অর্থায়নের দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে জলবায়ু প্রকল্পে অর্থায়নের গতি কমতে পারে। তবে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সড়ক ও মৌলিক অবকাঠামো খাতে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
সবুজ অঙ্গীকার থেকে নীতির পরিবর্তন
২০২৩ সালে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক ঘোষণা দিয়েছিল, তাদের ঋণের বড় একটি অংশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানো এবং অভিযোজনমূলক প্রকল্পে ব্যয় করা হবে। সেই লক্ষ্য অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের মোট ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দও করে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে সেই নির্দিষ্ট লক্ষ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে জলবায়ু অর্থায়নকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাংকের আগের কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।
কেন বদলালো অবস্থান
এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দেখা হচ্ছে। নতুন মার্কিন প্রশাসন মনে করে, জলবায়ুকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার ফলে দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মৌলিক উন্নয়ন চাহিদা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছিল না।
বিশ্বব্যাংকের সবচেয়ে বড় শেয়ারধারী হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মতামত প্রতিষ্ঠানটির নীতিনির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলে। ফলে জলবায়ু ব্যয়ের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ধরে রাখার পক্ষে কিছু দেশের সমর্থন থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বহাল রাখা সম্ভব হয়নি।
পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে
বিশ্বব্যাংকের ভেতরেও দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে মতপার্থক্য ছিল। এক পক্ষের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন বা উপকূল সুরক্ষার মতো প্রকল্প ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় অপরিহার্য।
অন্য পক্ষের যুক্তি ছিল, সীমিত অর্থের বড় অংশ এসব খাতে ব্যয় করলে দরিদ্র দেশগুলোর হাসপাতাল, বিদ্যালয়, সড়ক ও অন্যান্য জরুরি উন্নয়ন প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের মতে, দারিদ্র্য দূরীকরণই উন্নয়ন ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
দরিদ্র দেশগুলোর জন্য কী অর্থ বহন করে

নীতির এই পরিবর্তনে অনেক নিম্ন আয়ের দেশ স্বস্তি প্রকাশ করছে। কারণ তাদের ধারণা, এখন উন্নয়ন ঋণের বড় অংশ আবার মৌলিক অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রকল্পে ফিরে আসতে পারে।
অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য এটি উদ্বেগেরও কারণ। কারণ পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রচেষ্টা ধীর হতে পারে।
সামনে কী হতে পারে
বিশ্বব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, জলবায়ু লক্ষ্য বাতিল হলেও বাস্তবে অনেক প্রকল্প উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই অনুমোদন পেতে পারে। অর্থাৎ প্রকল্পের ধরন খুব বেশি না বদলালেও সেগুলোর শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তিত হতে পারে।
তবে এই পরিবর্তন একটি বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে—জলবায়ু ও দারিদ্র্য মোকাবিলাকে কি আলাদা লক্ষ্য হিসেবে দেখা উচিত, নাকি উন্নয়নের সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যেই উভয় বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়াই বেশি কার্যকর।
বিশ্বব্যাংকের নতুন অবস্থান সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণে নতুন ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা চলবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















