এক সময় মনে হচ্ছিল, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দ্রুত কমে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির হার থেকে শুরু করে চিকিৎসা, আইন ও করপোরেট নেতৃত্ব—প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারায় ভাটা পড়ার ইঙ্গিত মিলছে। উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ, নেতৃত্বে প্রতিনিধিত্ব এবং বেতন বৈষম্যের ক্ষেত্রে আবারও পিছিয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
নেতৃত্বের শীর্ষে নারীদের অগ্রগতি ধীর
করপোরেট বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি গত দুই দশক ধরে ধীরে ধীরে বাড়ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই অগ্রগতি থেমে যাওয়ার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে উল্টো কমতেও শুরু করেছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পদে নারীদের অংশ কমেছে। পরিচালনা পর্ষদে নতুন নিয়োগেও আগের তুলনায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব হ্রাস পেয়েছে।
আর্থিক খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। শীর্ষ নেতৃত্বের সম্ভাব্য নারী প্রার্থীদের সংখ্যা কমে এসেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে পুরুষদের আধিপত্য আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

পূর্ণকালীন চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ কমছে
শুধু শীর্ষ নেতৃত্ব নয়, সামগ্রিক কর্মসংস্থানেও উদ্বেগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে পূর্ণকালীন চাকরিতে কর্মরত নারীদের হার সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমেছে, যা দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক উন্নতির পর প্রথম উল্লেখযোগ্য পতন।
বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত এবং অল্পবয়সী সন্তান রয়েছে—এমন মায়েদের মধ্যে কর্মক্ষেত্র থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বহু বছর ধরে অংশগ্রহণের হার বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে সেটি ধারাবাহিকভাবে কমছে।
আবার বাড়ছে বেতন বৈষম্য
দীর্ঘদিন ধরে কমতে থাকা নারী-পুরুষের বেতন ব্যবধানও আবার বাড়তে শুরু করেছে। কিছু উন্নত দেশে টানা দুই বছর ধরে এই বৈষম্য বেড়েছে। শুধু আয়ের ক্ষেত্রেই নয়, পদোন্নতির আগ্রহেও নারী ও পুরুষের মধ্যে নতুন করে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা গেছে, পুরুষ কর্মীদের তুলনায় নারীরা উচ্চপদে যাওয়ার আগ্রহ আগের মতো বাড়াচ্ছেন না। বিশেষ করে কর্মজীবনের শুরুতে থাকা নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা আরও বেশি।
সন্তান লালন-পালন বড় বাধা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। মহামারির সময় বিপুলসংখ্যক নিম্ন আয়ের নারী চাকরি হারিয়েছিলেন। পরে তারা কর্মক্ষেত্রে ফিরে এলেও শ্রমবাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতা নতুন বৈষম্য তৈরি করেছে।
এর পাশাপাশি শিশুদের জন্য মানসম্মত পরিচর্যা কেন্দ্রের সংকটও বড় সমস্যা। সরকারি সহায়তা বাড়লেও অনেক দেশে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সেবা নেই। ফলে অনেক নারী সন্তান লালন-পালনের দায়িত্বের কারণে পূর্ণকালীন চাকরি চালিয়ে যেতে পারছেন না।
নীতিগত পরিবর্তনেরও প্রভাব
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার উদ্যোগের গতি কমে যাওয়া। কিছু দেশে এসব নীতির প্রতি আগের মতো জোর দেওয়া হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানও কর্মসংস্কৃতিতে পরিবর্তন এনে আগের উদ্যোগগুলো থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক দশকে নারীরা শিক্ষা ও পেশাগত যোগ্যতায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করলেও সেই অর্জন ধরে রাখতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতি, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ এবং পরিবারবান্ধব ব্যবস্থা। অন্যথায় বহু বছরের অগ্রগতি ধীরে ধীরে আবারও পিছিয়ে যেতে পারে।
নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের সুযোগ শুধু সমতার প্রশ্ন নয়, এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা এবং সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই বর্তমান প্রবণতা নীতিনির্ধারক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—সবার জন্যই নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















