বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এশিয়ায় তীব্র গরমের কারণে জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের জন্য নির্ধারিত অনেক এলএনজি কার্গো পথ পরিবর্তন করে এশিয়ার দিকে যাচ্ছে। এর ফলে শীতের আগে ইউরোপে গ্যাসের মজুত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে যদি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে দেরি হয় বা নতুন কোনো সংকট দেখা দেয়।
এশিয়ার চাহিদায় ইউরোপে চাপ
এবারের গ্রীষ্মে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ বিদ্যুতের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এলএনজির জন্য ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এশিয়ার ক্রেতারা বেশি দাম দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজও গন্তব্য পরিবর্তন করছে।
অন্যদিকে ইউরোপে গত শীতের উচ্চ ব্যবহারের কারণে গ্যাসের মজুত কমে গেছে। বছরের এই সময়ে মজুতের পরিমাণ গত দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। তাই আগামী শীতের আগে পর্যাপ্ত গ্যাস সংগ্রহ করাই এখন ইউরোপের বড় চ্যালেঞ্জ।

কাতারের সরবরাহে ধাক্কা
বিশ্ববাজারে এলএনজির অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী কাতার। তবে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে দেশটির রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু জাহাজ চলাচল আবার শুরু হলেও তা এখনও স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ইউরোপ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুরোপুরি পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে চলতি বছরে বৈশ্বিক বাজারে কয়েক কোটি টন এলএনজির ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেন বাড়ছে ঝুঁকি
বর্তমানে বাজার এতটাই টানটান অবস্থায় রয়েছে যে কয়েকটি ছোট ধাক্কাও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
প্রথম ঝুঁকি হলো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে দেরি হওয়া। যদি নতুন করে উত্তেজনা বাড়ে, তাহলে এশিয়ার ক্রেতারা আরও বেশি দামে এলএনজি কিনতে শুরু করবে। এতে ইউরোপের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো চরম আবহাওয়া। ইউরোপে রেকর্ড তাপমাত্রা এবং এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী গরম বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোও আবার আন্তর্জাতিক স্পট বাজার থেকে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। যদি গরম আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে চাহিদা আরও বাড়বে।
তৃতীয় ঝুঁকি অবকাঠামোগত সমস্যা। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনে বাধা কিংবা এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা—এসব ঘটনাও সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
চীনের ভূমিকা বাড়াচ্ছে অনিশ্চয়তা
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি আমদানিকারক চীনের ক্রয়নীতি বাজারকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। চাহিদা কম থাকলে দেশটি অতিরিক্ত গ্যাস পুনরায় বিক্রি করে, আবার তাপপ্রবাহ দেখা দিলে দ্রুত বড় পরিমাণে আমদানি শুরু করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা আরও তীব্র হচ্ছে।
ইউরোপে শীত কাটবে, তবে ব্যয় বাড়বে
যদি সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাতারের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়, তাহলে ইউরোপ শীতের আগে কিছুটা গ্যাস মজুত করতে পারবে। তবে সেটি স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকবে। বড় কোনো নতুন সংকট না হলে জ্বালানির ঘাটতিতে ইউরোপ অচল হয়ে পড়বে না, কিন্তু গ্যাস ও তাপের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক নেতিবাচক ঘটনা একই সময়ে ঘটলে এলএনজি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে এশিয়ার অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে হবে, আর ইউরোপকে গুনতে হতে পারে অনেক বেশি জ্বালানি বিল।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















