ইউরোপের অর্থনীতি ধীরগতির হলেও সেখানকার শেয়ারবাজারকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কম হলেও ইউরোপের অনেক বড় প্রতিষ্ঠানের আয়, বৈশ্বিক উপস্থিতি এবং ব্যবসায়িক ভিত্তি এখনও শক্তিশালী। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় শেয়ার দীর্ঘমেয়াদে আকর্ষণীয় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতি আর শেয়ারবাজার সব সময় এক পথে চলে না
অনেকেই মনে করেন, একটি দেশের অর্থনীতি যত দ্রুত বাড়বে, সেই দেশের শেয়ারবাজারও তত ভালো করবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি সব সময় এমন নয়। দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শেয়ারবাজারের রিটার্নের মধ্যে অনেক সময় সরাসরি সম্পর্ক থাকে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশেও বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক কম মুনাফা পেয়েছেন।
এই বাস্তবতা থেকেই ইউরোপের বর্তমান শেয়ারবাজারকে নতুনভাবে মূল্যায়নের আহ্বান জানানো হচ্ছে।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে জর্জরিত ইউরোপ
ইউরোপের অর্থনীতি এখন নানা সমস্যার মুখোমুখি। চলতি বছরে ইউরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি উন্নত বিশ্বের গড় প্রবৃদ্ধির চেয়েও কম থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য অর্থনীতির তুলনায় ইউরোপ পিছিয়ে পড়ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় ইউরোপের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অভাব, পর্যাপ্ত ডেটা সেন্টার না থাকা, বিদ্যুৎ অবকাঠামোর চাপ এবং আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা অঞ্চলটির দুর্বলতা আরও স্পষ্ট করেছে। আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে এসব ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
তবু ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর ভিত্তি শক্ত
অর্থনৈতিক দুর্বলতা থাকলেও ইউরোপের বড় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয়ের বড় অংশ আসে ইউরোপের বাইরের বাজার থেকে। মোট আয়ের অর্ধেকেরও বেশি উন্নত ইউরোপীয় অর্থনীতির বাইরে থেকে আসে। বাজারমূল্যের হিসাবে এই অনুপাত আরও বেশি।
অর্থাৎ ইউরোপের শেয়ারে বিনিয়োগ মানেই শুধু ইউরোপের অর্থনীতির ওপর নির্ভর করা নয়; বরং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির অংশীদার হওয়া।
যুদ্ধ ও অস্থিরতাও কিছু খাতের জন্য ইতিবাচক
![]()
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অস্থিরতার সময় অনেক বিনিয়োগকারী ইউরোপীয় শেয়ার থেকে দূরে সরে যান। কিন্তু বাস্তবে জ্বালানি, রাসায়নিক এবং পণ্যভিত্তিক শিল্পের অনেক ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের মুনাফা তখন বেড়ে যায়।
অন্যদিকে সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যায় কিছু শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সামগ্রিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক সীমিত থাকে। তবু যুদ্ধের খবর এলেই বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ ইউরোপীয় বাজার এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখান।
মূল্যস্ফীতিও হতে পারে কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য সুবিধা
মূল্যস্ফীতি বাড়লে সাধারণত বাস্তব সম্পদভিত্তিক ব্যবসাগুলো ভালো অবস্থানে থাকে। ইউরোপের শেয়ারবাজারের বড় অংশই এমন প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত, যারা পণ্য, যন্ত্রপাতি বা উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।
এছাড়া ব্যাংকিং খাতও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের পরিবেশে তুলনামূলক ভালো আয় করতে পারে। ফলে বাজারের উল্লেখযোগ্য অংশ এমন খাতের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সুবিধা পেতে পারে।
আয় বৃদ্ধির প্রত্যাশায় আশাবাদী বিশ্লেষকেরা
বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর শেয়ারপ্রতি আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। যদিও এই প্রবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম হতে পারে, তবুও কয়েক বছর আগের পূর্বাভাসের তুলনায় এটি অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের অর্থনীতি নিয়ে হতাশা থাকলেও শেয়ারবাজারকে সেই একই দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ইউরোপের বড় কোম্পানিগুলোর ব্যবসা এখন অনেকটাই বৈশ্বিক, আর সেটিই ভবিষ্যতের সম্ভাবনার প্রধান ভিত্তি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















