বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আরও ছোট ও ঘন ট্রানজিস্টর তৈরি করে কম্পিউটার চিপের ক্ষমতা বাড়ানোর যে পথ অনুসরণ করা হচ্ছিল, তা এখন পদার্থবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন চিপকে উল্লম্বভাবে বা স্তরে স্তরে নির্মাণের দিকে ঝুঁকছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে এই প্রযুক্তিই চিপশিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
সমতল থেকে ত্রিমাত্রিক নকশায় যাত্রা
দশকের পর দশক ধরে চিপ নির্মাতারা একই সিলিকন স্তরে কোটি কোটি ট্রানজিস্টর বসিয়ে প্রসেসর তৈরি করে এসেছে। ট্রানজিস্টরের আকার ছোট হওয়ায় একই জায়গায় আরও বেশি উপাদান বসানো সম্ভব হয়েছে, ফলে বেড়েছে গতি ও কমেছে বিদ্যুৎ খরচ।
কিন্তু এখন ট্রানজিস্টর এতটাই ক্ষুদ্র হয়ে গেছে যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ প্রবাহ, অতিরিক্ত তাপ এবং উৎপাদন ব্যয় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আগের মতো শুধুই আকার ছোট করে উন্নতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নতুন প্রযুক্তিতে বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রানজিস্টরকে একটির ওপর আরেকটি বসিয়ে নতুন ধরনের চিপ তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এতে একই জায়গায় আরও বেশি উপাদান ব্যবহার করা সম্ভব হবে এবং চিপের কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
নতুন এই নকশায় কম জায়গায় বেশি লজিক সার্কিট বসানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের গতি বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দশকের শুরুতে এ ধরনের প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাড়বে দক্ষতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রজন্মের উল্লম্ব ট্রানজিস্টর প্রযুক্তির মাধ্যমে একই কাজ করতে প্রয়োজনীয় জায়গা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে অথবা একই ক্ষমতায় অনেক কম শক্তি ব্যবহার করা যাবে।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আধুনিক চিপ উৎপাদনে প্রতিটি নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তির খরচ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। ফলে শিল্পের জন্য আরও কার্যকর ও অর্থনৈতিক বিকল্প খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক চাপেও বদলাচ্ছে প্রযুক্তির পথ
চিপ প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু বৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতা নয়, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রাখছে। উন্নত চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কিছু অত্যাধুনিক উৎপাদন যন্ত্রের সীমিত প্রাপ্যতা অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উৎসাহিত করেছে।
এই কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান এমন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে, যেখানে পুরো সার্কিটকে একাধিক স্তরে ভাগ করে মুখোমুখি যুক্ত করা হয়। এতে বৈদ্যুতিক সংকেতকে কম দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়, ফলে তথ্য আদান-প্রদানের গতি বাড়ে এবং শক্তির ব্যবহারও কমে।
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
তবে ত্রিমাত্রিক চিপ তৈরির পথ মোটেও সহজ নয়। একটির ওপর আরেকটি স্তর বসানোর ফলে তাপ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে উৎপাদনে অত্যন্ত সূক্ষ্ম নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে হয়। কোনো একটি স্তরে সামান্য ত্রুটি থাকলেও পুরো চিপ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এ ছাড়া বর্তমান চিপ নকশার সফটওয়্যারও মূলত সমতল কাঠামোর জন্য তৈরি। তাই নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে নকশা ও উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।
ভবিষ্যতের দৌড়ে নতুন দিক
বিশ্লেষকদের মতে, চিপশিল্প এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু ট্রানজিস্টরের আকার ছোট করেই আর অগ্রগতি ধরে রাখা সম্ভব নয়। তাই ত্রিমাত্রিক নকশা আগামী দিনের কম্পিউটিং প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
যদিও এই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হতে এখনও কয়েক বছর সময় লাগবে, তবু বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতাদের বিনিয়োগ ও গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে— ভবিষ্যতের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর তৈরি হবে শুধু বিস্তৃত নয়, বরং আকাশমুখী নকশায়।




















