০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
রেমিট্যান্সকে শুধু টিকে থাকার অর্থ নয়, উন্নয়নের পুঁজিতে রূপ দিতে হবে জিও নিউজের সম্প্রচার আবার শুরু, ১৫ দিনের স্থগিতাদেশ বহাল রাখল পেমরা তামিলনাড়ুতে প্রতিদ্বন্দ্বী, দিল্লিতে একজোট? বিজয়ের টিভিকে নিয়ে ডিএমকের আপত্তিতে নতুন জটিলতা ইন্ডিয়া জোটে বেলুচিস্তানে ‘অপারেশন শাবান’ অব্যাহত, নিহত আরও ৭; মোট নিহত ৭১ সন্ত্রাসী ভারতে সেন্সর কাট, যুক্তরাজ্যে আনকাট মুক্তি পাচ্ছে বিজয়ের ‘জন নায়াগন’ বন্যায় ১০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, মাথাপিছু বরাদ্দ মাত্র ৩.২ কেজি চাল ও ২৮ টাকা বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে মৃত বেড়ে ৫১, সাত জেলায় খুলেছে ১,০৪৯ আশ্রয়কেন্দ্র রাজধানীর বাজারে হাঁটুসমান পানি, দোকান ডুবে ব্যবসায়ীদের কোটি টাকার ক্ষতির শঙ্কা লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর আগে ইরানের হুমকি নিয়ে তার দৃঢ় মন্তব্য বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ৫ দিন পর আবার চালু ঢাকা-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ট্রেন চলাচল

রেমিট্যান্সকে শুধু টিকে থাকার অর্থ নয়, উন্নয়নের পুঁজিতে রূপ দিতে হবে

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি অভিবাসী শ্রমিক প্রতি মাসে তাদের উপার্জনের একটি অংশ নিজ দেশে পাঠান। এই অর্থে চলে সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা, ঘরের মেরামত কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। অনেক পরিবারের জন্য এটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস। কিন্তু রেমিট্যান্সের প্রকৃত গুরুত্ব কেবল পারিবারিক ব্যয় নির্বাহে সীমাবদ্ধ নয়। সঠিক নীতি, প্রযুক্তি এবং আর্থিক ব্যবস্থার সহায়তা পেলে এই অর্থ একটি দেশের অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উৎপাদনশীল করে তুলতে পারে।

আজকের বিশ্বে রেমিট্যান্স উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এক কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক রেমিট্যান্স প্রবাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৮৫৬ বিলিয়ন ডলারে, যার মধ্যে ৬৫৩ বিলিয়ন ডলার গেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বহু দেশের ক্ষেত্রে এই অর্থপ্রবাহ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কিংবা সরকারি উন্নয়ন সহায়তার চেয়েও বড়। ফলে রেমিট্যান্সকে শুধু পারিবারিক সহায়তা হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে; এটিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

তবে এই সম্ভাবনা এখনও সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত নয়। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিভাজন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সীমান্তপারের অর্থপ্রদানের জটিলতা রেমিট্যান্স পাঠানোকে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত করে তুলছে। এর পাশাপাশি ডিজিটাল আর্থিক সেবায় অসম প্রবেশাধিকার লক্ষ লক্ষ মানুষকে এখনও তুলনামূলক ব্যয়বহুল নগদভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে।

গত এক দশকে অবশ্য উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০০৯ সালে যেখানে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় ব্যয় ছিল ৯ শতাংশের বেশি, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৬ শতাংশে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একসময় ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর খরচ নগদভিত্তিক ব্যবস্থার তুলনায় বেশি ছিল; এখন পরিস্থিতি উল্টো। বর্তমানে ডিজিটাল রেমিট্যান্সের গড় ব্যয় প্রায় ৪ শতাংশ, যেখানে নগদ লেনদেনে তা প্রায় ৭ শতাংশ।

এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করেছে প্রযুক্তির বিস্তার, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, তথ্যনির্ভর সেবা এবং আরও দক্ষ বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা। ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে সঠিক নীতি ও অবকাঠামো থাকলে রেমিট্যান্সের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

কিন্তু ডিজিটাল অগ্রগতির সুফল এখনও সমানভাবে পৌঁছায়নি। যাদের স্মার্টফোন রয়েছে, ডিজিটাল পরিচয়পত্র আছে এবং ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারেন, তারা কম খরচে সেবা পান। অন্যদিকে নথিপত্রের সীমাবদ্ধতা, ইন্টারনেট সংযোগের অভাব কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভিজ্ঞতার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনও নগদভিত্তিক ব্যয়বহুল সেবার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। ফলে একই অর্থপাঠানোর পথেও ডিজিটাল ও অ-ডিজিটাল ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটি নতুন বৈষম্য তৈরি হয়েছে।

17 Partnerships for the goals: Remittances: a lifeline for many economies

এই ব্যবধান দূর করতে কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, ডিজিটাল রেমিট্যান্স সেবাদাতাদের দ্রুতগতির দেশীয় পেমেন্ট অবকাঠামো বা ফাস্ট পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণা বলছে, প্রেরণকারী বা গ্রহণকারী দেশে এমন ব্যবস্থা চালু থাকলে মাত্র ২০০ ডলারের একটি রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। কারণ এতে ব্যয়বহুল প্রচলিত ব্যাংকিং চেইনের ওপর নির্ভরতা কমে এবং নতুন সেবাদাতাদের জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়। আন্তঃদেশীয় জটিল সমন্বয়ের অপেক্ষা না করেও কেবল দেশীয় দ্রুত পেমেন্ট ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়িয়ে তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানো জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই কম ব্যয়ের ডিজিটাল সেবা বিদ্যমান থাকলেও ব্যবহারকারীরা তথ্যের অভাব, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বা প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে তা ব্যবহার করেন না। সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ বাধার একটি অংশ দূর করা সম্ভব। তবে শুধু প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়; পরিচয় যাচাইয়ের কঠোর নিয়ম কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতাও সংস্কার করতে হবে, যাতে প্রান্তিক অভিবাসীরাও ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারেন।

তৃতীয়ত, রেমিট্যান্স বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক ও অ-ব্যাংক উভয় ধরনের সেবাদাতার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হলে নতুন উদ্ভাবন বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তার সুফল ভোক্তার কাছেই পৌঁছাবে। গত কয়েক বছরে ব্যয় কমার অন্যতম কারণ ছিল নতুন ডিজিটাল ব্যবসায়িক মডেলের আবির্ভাব। সেই প্রবণতাকে আরও বিস্তৃত করা এখন সময়ের দাবি।

তবে রেমিট্যান্সের প্রকৃত শক্তি অর্থ পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত অর্থপ্রাপ্তির তথ্য যদি আনুষ্ঠানিক আর্থিক ইতিহাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে যেসব পরিবারের কোনো ঋণ-ইতিহাস নেই, তারাও ক্ষুদ্রঋণ বা উৎপাদনমুখী অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্সভিত্তিক সঞ্চয় প্রকল্প পরিবারকে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত করতে পারে। স্বাস্থ্য ও জীবনবিমার মতো সেবাও এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব, যা সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এসব সেবা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজে এবং কম খরচে দেওয়া সম্ভব। তাই রেমিট্যান্সকে শুধু অর্থ স্থানান্তরের একটি লেনদেন হিসেবে না দেখে, একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সম্পর্কের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।

বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এর তাৎপর্য আরও গভীর। আগামী এক দশকে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। তাদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যদি নিয়মিত রেমিট্যান্স প্রবাহকে সঞ্চয়, ঋণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়নের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়, তাহলে এই অর্থ অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রাথমিক পুঁজিতে পরিণত হতে পারে। স্থানীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও রেমিট্যান্স একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

অভিবাসীরা ঘর ছেড়ে বিদেশে যান পরিবারের উন্নত ভবিষ্যতের আশায়। তাঁদের পাঠানো প্রতিটি অর্থের পেছনে রয়েছে ত্যাগ, শ্রম এবং প্রত্যাশার গল্প। তাই নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি আর্থিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে রেমিট্যান্স কেবল দৈনন্দিন জীবনের ভরসা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং নতুন কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে পরিণত হয়। তখনই এই অর্থপ্রবাহের প্রকৃত সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রেমিট্যান্সকে শুধু টিকে থাকার অর্থ নয়, উন্নয়নের পুঁজিতে রূপ দিতে হবে

রেমিট্যান্সকে শুধু টিকে থাকার অর্থ নয়, উন্নয়নের পুঁজিতে রূপ দিতে হবে

০৮:০০:২০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি অভিবাসী শ্রমিক প্রতি মাসে তাদের উপার্জনের একটি অংশ নিজ দেশে পাঠান। এই অর্থে চলে সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা, ঘরের মেরামত কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। অনেক পরিবারের জন্য এটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস। কিন্তু রেমিট্যান্সের প্রকৃত গুরুত্ব কেবল পারিবারিক ব্যয় নির্বাহে সীমাবদ্ধ নয়। সঠিক নীতি, প্রযুক্তি এবং আর্থিক ব্যবস্থার সহায়তা পেলে এই অর্থ একটি দেশের অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উৎপাদনশীল করে তুলতে পারে।

আজকের বিশ্বে রেমিট্যান্স উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এক কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক রেমিট্যান্স প্রবাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৮৫৬ বিলিয়ন ডলারে, যার মধ্যে ৬৫৩ বিলিয়ন ডলার গেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বহু দেশের ক্ষেত্রে এই অর্থপ্রবাহ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কিংবা সরকারি উন্নয়ন সহায়তার চেয়েও বড়। ফলে রেমিট্যান্সকে শুধু পারিবারিক সহায়তা হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে; এটিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

তবে এই সম্ভাবনা এখনও সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত নয়। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিভাজন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সীমান্তপারের অর্থপ্রদানের জটিলতা রেমিট্যান্স পাঠানোকে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত করে তুলছে। এর পাশাপাশি ডিজিটাল আর্থিক সেবায় অসম প্রবেশাধিকার লক্ষ লক্ষ মানুষকে এখনও তুলনামূলক ব্যয়বহুল নগদভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে।

গত এক দশকে অবশ্য উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০০৯ সালে যেখানে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় ব্যয় ছিল ৯ শতাংশের বেশি, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৬ শতাংশে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একসময় ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর খরচ নগদভিত্তিক ব্যবস্থার তুলনায় বেশি ছিল; এখন পরিস্থিতি উল্টো। বর্তমানে ডিজিটাল রেমিট্যান্সের গড় ব্যয় প্রায় ৪ শতাংশ, যেখানে নগদ লেনদেনে তা প্রায় ৭ শতাংশ।

এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করেছে প্রযুক্তির বিস্তার, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, তথ্যনির্ভর সেবা এবং আরও দক্ষ বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা। ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে সঠিক নীতি ও অবকাঠামো থাকলে রেমিট্যান্সের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

কিন্তু ডিজিটাল অগ্রগতির সুফল এখনও সমানভাবে পৌঁছায়নি। যাদের স্মার্টফোন রয়েছে, ডিজিটাল পরিচয়পত্র আছে এবং ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারেন, তারা কম খরচে সেবা পান। অন্যদিকে নথিপত্রের সীমাবদ্ধতা, ইন্টারনেট সংযোগের অভাব কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভিজ্ঞতার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনও নগদভিত্তিক ব্যয়বহুল সেবার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। ফলে একই অর্থপাঠানোর পথেও ডিজিটাল ও অ-ডিজিটাল ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটি নতুন বৈষম্য তৈরি হয়েছে।

17 Partnerships for the goals: Remittances: a lifeline for many economies

এই ব্যবধান দূর করতে কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, ডিজিটাল রেমিট্যান্স সেবাদাতাদের দ্রুতগতির দেশীয় পেমেন্ট অবকাঠামো বা ফাস্ট পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণা বলছে, প্রেরণকারী বা গ্রহণকারী দেশে এমন ব্যবস্থা চালু থাকলে মাত্র ২০০ ডলারের একটি রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। কারণ এতে ব্যয়বহুল প্রচলিত ব্যাংকিং চেইনের ওপর নির্ভরতা কমে এবং নতুন সেবাদাতাদের জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়। আন্তঃদেশীয় জটিল সমন্বয়ের অপেক্ষা না করেও কেবল দেশীয় দ্রুত পেমেন্ট ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়িয়ে তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানো জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই কম ব্যয়ের ডিজিটাল সেবা বিদ্যমান থাকলেও ব্যবহারকারীরা তথ্যের অভাব, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বা প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে তা ব্যবহার করেন না। সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ বাধার একটি অংশ দূর করা সম্ভব। তবে শুধু প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়; পরিচয় যাচাইয়ের কঠোর নিয়ম কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতাও সংস্কার করতে হবে, যাতে প্রান্তিক অভিবাসীরাও ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারেন।

তৃতীয়ত, রেমিট্যান্স বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক ও অ-ব্যাংক উভয় ধরনের সেবাদাতার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হলে নতুন উদ্ভাবন বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তার সুফল ভোক্তার কাছেই পৌঁছাবে। গত কয়েক বছরে ব্যয় কমার অন্যতম কারণ ছিল নতুন ডিজিটাল ব্যবসায়িক মডেলের আবির্ভাব। সেই প্রবণতাকে আরও বিস্তৃত করা এখন সময়ের দাবি।

তবে রেমিট্যান্সের প্রকৃত শক্তি অর্থ পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত অর্থপ্রাপ্তির তথ্য যদি আনুষ্ঠানিক আর্থিক ইতিহাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে যেসব পরিবারের কোনো ঋণ-ইতিহাস নেই, তারাও ক্ষুদ্রঋণ বা উৎপাদনমুখী অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্সভিত্তিক সঞ্চয় প্রকল্প পরিবারকে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত করতে পারে। স্বাস্থ্য ও জীবনবিমার মতো সেবাও এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব, যা সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এসব সেবা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজে এবং কম খরচে দেওয়া সম্ভব। তাই রেমিট্যান্সকে শুধু অর্থ স্থানান্তরের একটি লেনদেন হিসেবে না দেখে, একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সম্পর্কের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।

বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এর তাৎপর্য আরও গভীর। আগামী এক দশকে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। তাদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যদি নিয়মিত রেমিট্যান্স প্রবাহকে সঞ্চয়, ঋণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়নের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়, তাহলে এই অর্থ অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রাথমিক পুঁজিতে পরিণত হতে পারে। স্থানীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও রেমিট্যান্স একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

অভিবাসীরা ঘর ছেড়ে বিদেশে যান পরিবারের উন্নত ভবিষ্যতের আশায়। তাঁদের পাঠানো প্রতিটি অর্থের পেছনে রয়েছে ত্যাগ, শ্রম এবং প্রত্যাশার গল্প। তাই নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি আর্থিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে রেমিট্যান্স কেবল দৈনন্দিন জীবনের ভরসা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং নতুন কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে পরিণত হয়। তখনই এই অর্থপ্রবাহের প্রকৃত সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে।