ফ্রান্স ও আলজেরিয়ার সম্পর্ক বহু দশক ধরে ইতিহাস, অভিবাসন, নিরাপত্তা, জ্বালানি এবং ঔপনিবেশিক অতীতের জটিল ভার বহন করে এসেছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, দীর্ঘদিনের উত্তেজনার পর আবারও সংলাপের পথ খুলছে। আর সেই পরিবর্তনের মুহূর্তেই ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সেগোলেন রয়ালের মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সংঘাতমুখী পররাষ্ট্রনীতি কি সত্যিই ফ্রান্সের স্বার্থ রক্ষা করেছে, নাকি উল্টো কৌশলগত ক্ষতিই ডেকে এনেছে?
রয়ালের বক্তব্যের মূল সুর হলো, আলজেরিয়াকে ঘিরে ফরাসি সরকারের দীর্ঘদিনের কঠোর অবস্থান শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। বরং নিরাপত্তা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং জ্বালানি অংশীদারত্ব—সব ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত যখন প্যারিস আবার সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথেই ফিরছে, তখন স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে কয়েক বছরের সংঘাতমূলক অবস্থান বাস্তবে কোনো স্থায়ী সাফল্য এনে দেয়নি।
সম্প্রতি ফরাসি বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁর আলজেরিয়া সফরকে অনেকে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এই সফর কেবল একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে উভয় দেশই দীর্ঘ অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে বাস্তববাদী সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
রয়ালের সমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি মনে করেন ফরাসি সরকার এমন ভাষা ও নীতি অনুসরণ করেছে, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিশেষ করে অভিবাসননীতি কঠোর করা, আলজেরীয় নাগরিকদের জন্য ভিসা ইস্যুতে সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের তীব্রতা পারস্পরিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাঁর দৃষ্টিতে, এসব পদক্ষেপ আলোচনার পরিবেশ তৈরির পরিবর্তে বিরোধকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।

অবশ্য এই বিতর্ক কেবল সরকার বনাম বিরোধী রাজনীতির প্রশ্ন নয়। ফ্রান্স ও আলজেরিয়ার সম্পর্ক এমন এক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ইতিহাসের ক্ষত এখনো রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। ঔপনিবেশিক শাসনের স্মৃতি, স্বাধীনতা যুদ্ধের উত্তরাধিকার, বিপুল আলজেরীয় অভিবাসী জনগোষ্ঠী এবং দুই দেশের গভীর অর্থনৈতিক সংযোগ—সব মিলিয়ে সম্পর্কটি আবেগ ও কৌশলগত স্বার্থের জটিল সমন্বয়। ফলে যেকোনো রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব দ্রুতই বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে।
ফ্রান্স-আলজেরিয়া অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হওয়ার পর রয়াল নিজেও সংলাপভিত্তিক কূটনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর উদ্যোগে আলজেরিয়ায় একাধিক সফর এবং উভয় দেশের মধ্যে সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ঐতিহাসিক নথিপত্র, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ, বিচারিক সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় কাঠামো নিয়ে কথোপকথনের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ধারণা, দীর্ঘদিনের জটিলতা সমাধানের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো ধারাবাহিক সংলাপ, প্রকাশ্য সংঘর্ষ নয়।
তবে রয়ালের অবস্থান ফরাসি রাজনীতিতে সর্বজনস্বীকৃত নয়। বরং ডানপন্থী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক মহলের অনেকেই সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আলজেরিয়ার প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়তা দেখিয়েছেন এবং ফ্রান্সের অবস্থান আরও কঠোর হওয়া উচিত ছিল। অর্থাৎ একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফরাসি রাজনীতিতে দুই বিপরীত ব্যাখ্যা বিদ্যমান—একপক্ষ মনে করে কঠোরতা ব্যর্থ হয়েছে, অন্যপক্ষের বিশ্বাস কঠোরতা যথেষ্ট ছিল না।

এই মতপার্থক্য আসলে বৃহত্তর এক প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। আফ্রিকা এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ফ্রান্স কী ধরনের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে? প্রভাব বিস্তারের পুরোনো ধারণা, নাকি সমমর্যাদাভিত্তিক অংশীদারত্ব? রয়ালের বক্তব্য ইঙ্গিত করে যে অতীতের ঔপনিবেশিক মানসিকতা কিংবা অবজ্ঞাপূর্ণ কূটনৈতিক আচরণ শুধু আলজেরিয়ার সঙ্গেই নয়, আফ্রিকার আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক দুর্বল করেছে।
এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতা দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব বলপ্রয়োগ বা রাজনৈতিক চাপ দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না। পারস্পরিক সম্মান, স্বার্থের ভারসাম্য এবং নিয়মিত সংলাপই স্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তোলে।
ফ্রান্স ও আলজেরিয়ার মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার প্রক্রিয়া এখনও চলমান। তাৎক্ষণিক উত্তেজনা হয়তো কমবে, কিন্তু ফরাসি রাজনীতির ভেতরে এই সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত—সেই বিতর্ক অব্যাহত থাকবে। আর সেই বিতর্ক শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, আফ্রিকার প্রতি ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দর্শনও নির্ধারণ করতে পারে।
সামি বি. 


















