হুথি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পরিস্থিতি নিয়ে ইরানকে কঠোর বার্তা দিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের শীর্ষ পর্যায় থেকে তেহরানকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সৌদি আরবের ওপর হুথিদের যে কোনো হামলাকে পাকিস্তানের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
এই সপ্তাহে সৌদি আরবের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় ইসলামাবাদের উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাকিস্তানের ওই কর্মকর্তা বলেন, দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা পাকিস্তানের জন্যও ‘রেড লাইন’।
সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রভাব
গত বছর পাকিস্তান ও সৌদি আরব পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে উভয়ের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এর আগে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত ঘিরে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছিল পাকিস্তান। তবে সাম্প্রতিক হামলার পর সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি নিরাপত্তা উদ্বেগও বেড়েছে।
হামলার পটভূমি
হুথিরা অভিযোগ করে যে, সোমবার তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে সৌদি আরব হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। চার বছর ধরে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতির পর এই সীমান্তপারের হামলা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করলেও এখন পর্যন্ত এটি একক ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক উদ্বেগ
পাকিস্তানের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন সৌদি এলাকায় পাকিস্তানি সেনা সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। ফলে সংঘাত বিস্তৃত হলে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ঝুঁকিও সরাসরি বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে ইসলামাবাদে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, হুথিদের হামলা বাড়লে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এই সমুদ্রপথ পাকিস্তানসহ বহু দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে বলে ধারণা করেনি। বর্তমানে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে ভবিষ্যতে হুথিরা যদি সৌদি আরবের আরও বিস্তৃত এলাকায় হামলা চালায়, তাহলে ইসলামাবাদের অবস্থান আরও কঠোর হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা ও মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা
জ্বালানি আমদানির জন্য পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনায় পাকিস্তানের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জ্বালানি সংকট এড়াতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগেভাগে বন্ধসহ জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আঞ্চলিক উত্তেজনা কমিয়ে জ্বালানি সরবরাহের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা। এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানান, হতাশা থাকলেও ইসলামাবাদ এই মধ্যস্থতা উদ্যোগ থেকে সরে আসছে না, কারণ এতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্বার্থ জড়িত।
তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় পক্ষ বেছে নেওয়ার কাছাকাছি অবস্থানে দেখা যাচ্ছে। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র জানায়, যুদ্ধের অবসান সবার স্বার্থে হলেও সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চাইলে পাকিস্তান তাদের পাশেই দাঁড়াবে।
সৌদিতে হুথি হামলাকে পাকিস্তানের ওপর হামলা হিসেবে ঘোষণা; প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদের কঠোর অবস্থান ও আঞ্চলিক উত্তেজনার সর্বশেষ পরিস্থিতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















